শিক্ষা ও আমাদের শিক্ষার্থীরা

জোনাকী দত্ত | সোমবার , ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

কবি সুনির্মল বসু লিখেছেন –‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর / সবার আমি ছাত্র,/ নানান ভাবে নতুন জিনিস / শিখছি দিবা রাত্র।’ শিশুরা ছোট বেলা থেকেই যা দেখে তা শিখে। তাই তাদের এমন কিছু শেখানো উচিত যা থেকে তারা আনন্দ পায় এবং শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এমন শিক্ষা পরিবার এবং বিদ্যালয় থেকে তাদের দেওয়া উচিত যাতে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। শিক্ষাব্যবস্থা একটি দেশের শিক্ষা কাঠামো ও সুযোগের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শিশুদের শৈশব থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে। যে কোন মানুষের শিক্ষার পটভূমি হলো তার পরিবার। বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শিশুকে প্রস্তুত করে তোলে তার পরিবার। শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে শিক্ষার্থীরা তা আনন্দের সাথে গ্রহণ করতে পারে। শিক্ষা গ্রহণে অনাগ্রহ শিশুর মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টিতে শিক্ষকদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের সাথে পাঠদানের পদ্ধতি এবং নিজের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য শিক্ষকদের জানা একান্ত প্রয়োজন। এক এক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক এক রকম। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তিনটি পরিবর্তন আসে। প্রথম পরিবর্তনটি আসে ১৯৯৬ সালে। দ্বিতীয় পরিবর্তনটি আসে ২০১২ সালে এবং তৃতীয় পরিবর্তনটি আসে ২০২১ সালে।

প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে পড়াশোনা এবং হোমওয়ার্ক প্রদান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শিক্ষাদান করার জন্য শিক্ষকেরা মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর এবং ভিডিওর সমন্বয়ে শেখানো শুরু করেন। তখন এটাই ছিল আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি। এই শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুসারে প্রাক্‌প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা ছিল না। ক্লাসেই শ্রেণিশিক্ষকেরা ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করতেন।

চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের ওপর ৬০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন এবং ৪০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন। সিলেবাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে যে মূল্যায়ন, সেটাই সামষ্টিক মূল্যায়ন। এগুলো ছাড়া বাকি তিনটি বিষয় শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা এবং শিল্পকলা এগুলোর শতভাগ মূল্যায়ন শিখনকালীনই করা হবে। নতুন শিক্ষাক্রম সম্পর্কে শিক্ষকদের ধারণা দিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ মূল্যায়ন শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে করা হয়।

২০২৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, প্রযুক্তি ব্যবহারের বৃদ্ধি, এবং শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়ন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণিতে প্রত্যেক বিষয়ের উপর পরীক্ষা নিয়ে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে।

যখন পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে ১ম থেকে ৩য় শ্রেণিতে মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয় তখন বেশিরভাগ অভিভাবক পরীক্ষা পদ্ধতির পক্ষে সমর্থন করেন। তাদের মতে পরীক্ষা নেওয়া না হলে বাচ্চারা পড়তে চায় না বা তাদের লেখাপড়ার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। আবার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিত থাকতে হয়। তার শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির ভিত্তিতে শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। সেক্ষেত্রে অনুপস্থিত শিক্ষার্থী এই মূল্যায়ন থেকে পিছিয়ে থাকে। তাই এই বিবেচনায় পরীক্ষা নেয়া হলে সবার উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় এবং পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণের মাধ্যমে তার শিক্ষার মান যাচাই করা যায়।

সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। কোনও কোনও অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী মনে করে সৃজনশীল পদ্ধতির কারণে কোনও কিছু মুখস্থ করতে হয় না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী একটা কবিতা বা ছড়া মুখস্থ বলতে পারে না। এরা ধরেই নিয়েছে কবিতা মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই, প্রশ্নেই থাকবে। শুধু বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দিলেই হবে। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে।

বর্তমানে একটি শিশুর শিক্ষা দানে শিক্ষকের পাশাপাশি মাবাবার ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ একজন শিক্ষার্থীকে তার এগিয়ে যাওয়ার পথ অনেকটাই সুগম করতে পারে। সকলের সহযোগিতায় তারা কেবল শিক্ষিত হবে না, বরং শৃঙ্খলা, সম্মানবোধ, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার মত গুণাবলীও অর্জন করতে পারবে। কবি কুসুম কুমারী দাশ তাঁর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় লিখেছেন – ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? / কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধচুল নিয়ে চুলচেরা
পরবর্তী নিবন্ধসূর্য সেন : বিপ্লবের অবিনাশী নাম