শিক্ষক হস্তান্তর, সাইবার বুলিং ও গণমাধ্যম বিতর্কে অবস্থান জানাল চাকসু

চবি প্রতিনিধি | মঙ্গলবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অভিযুক্ত আইন বিভাগের এক শিক্ষকের পুনর্বাসন চেষ্টা, চাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও হুমকি এবং কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)

গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি। এ সময় ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠনের দোসরদের পুনর্বাসনের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে চাকসু।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘দোসর’ হিসেবে অভিযুক্ত চবির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানের পুনর্বাসনের চেষ্টা, চাকসুর নারী নেত্রীদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত সাইবার বুলিং এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামপ্রতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এই তিনটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, গত ১৬ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, মাদক সেবন এবং ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার বিপ্লবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও বিতর্কিত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান শুভ প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। সমপ্রতি ভর্তি পরীক্ষার সময় তাকে ‘হল গার্ড’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেও দেখা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সাঈদ বিন হাবিব আরও জানান, গত ১০ জানুয়ারি আইন অনুষদে ওই শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর চাকসুর নেতৃবৃন্দ সেখানে যান।

এ সময় তিনি পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধরে প্রক্টর অফিসে হস্তান্তর করা হয়। চাকসুর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ওই শিক্ষকের ডিজিটাল ডিভাইসে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের আলামত পাওয়া গেছে, যা সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে মামলা করতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে ছেড়ে দেয়। পরে চাকসু নেতারা হাটহাজারী থানায় মামলা করতে গেলে থানা প্রশাসন নানা অজুহাতে সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ওই শিক্ষককে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদ করায় চাকসুর সহছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস রিতাসহ একাধিক নারী নেত্রীকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধভাবে সাইবার বুলিং ও চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজে তাদের ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে অশ্লীল ও নারীবিদ্বেষী ভাষায় আক্রমণ, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায় চাকসু।

লিখিত বক্তব্যে চাকসুর জিএস বলেন, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম এবং যেকোনো ধরনের অনৈতিক ও সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। এ বিষয়ে কোনো আপোষ নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। ১০ জানুয়ারির ঘটনার পর কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যমে ঘটনাটিকে ‘মব’ ও ‘হেনস্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চাকসু। তারা জানায়, পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেখানে কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন বা সহিংস আচরণের প্রমাণ নেই। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮এর ৫৯ ধারা অনুযায়ী আমলযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে আটক করে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা আইনসম্মত, যা ‘মব’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা বলে মন্তব্য করে সংগঠনটি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামপ্রতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরে চাকসু জানায়, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী নিয়োগ সংক্রান্ত সব তথ্য ও নীতিগত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা প্রশাসনের দায়িত্ব। এতে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হবে বলে তারা মনে করে।

সংবাদ সম্মেলনে চাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ইব্রাহীম হোসেন রনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতার বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অটুট থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসন বিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া, সহসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জিহাদ আহনাফ, সহদপ্তর বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল আদন নুসরাত, ছাত্রী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক নাহিমা আক্তার দ্বীপা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক রাব্বি তাওহীদ, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক মোনায়েম শরীফ, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক মাসুম বিল্লাহসহ চাকসুর অন্যান্য প্রতিনিধিবৃন্দ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচবি বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা
পরবর্তী নিবন্ধসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের অনন্য সৌন্দর্য