চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে লালদীঘির পাড়। পাহাড়, নদী আর বন্দরনগরীর ব্যস্ততার মাঝেও এই স্থানটি বহন করে শতাব্দীপ্রাচীন এক নীরব ঐতিহ্য। প্রতিদিন এখানে ভেসে আসে দরুদ, জিকির ও প্রার্থনার ধ্বনি। সেই ধ্বনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মহান সাধকের স্মৃতি– হজরত শাহ সুফি আমানত (রহ.)। তিনি শুধু একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকই নন, বরং মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সৎ জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৮শ শতকে ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক জগতে হজরত শাহ সুফি আমানত (রহ.) ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর পূর্ণ নাম আমানাতুল্লাহ খান। জন্ম ভারতের বর্তমান বিহার শরীফে এক সম্ভ্রান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবারে। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মূলত ইরাকের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন কাদেরিয়া তরীকার প্রবর্তক গাউসুল আজম দস্তগীর হজরত মহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর বংশধরদের অন্যতম। তাঁর পিতা হজরত শাহ সুফী নিয়ামত উল্লাহ খান (রহ.)-এর নির্দেশে তিনি পিত্রালয় ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে প্রথমে কাশ্মীর এবং পরে মুর্শিদাবাদে গমন করেন। সেখানে প্রখ্যাত সুফি সাধক হজরত আবদুর রহীম শহীদ (রহ.)-এর কাছে কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া–মুজাদ্দেদিয়া এবং মাদারিয়া তরীকায় বায়াত গ্রহণ করেন এবং খেলাফত লাভ করেন।
মুর্শিদের নির্দেশে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সাধারণ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে আগমন করেন। সে সময় চট্টগ্রামে নবাবি শাসন বিদ্যমান ছিল। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি স্থানীয় আদালতে একটি সামান্য চাকরি গ্রহণ করেন। দিনভর আদালতের কাজে নিয়োজিত থাকলেও রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ইবাদত–বন্দেগি ও আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটাতেন। তাঁর বিনয়, সততা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা খুব দ্রুতই সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। এক পর্যায়ে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি ও কেরামতের নানা ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রচলিত একটি ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, এক অসহায় ব্যক্তিকে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি সদরঘাটে বসে রুমাল দিয়ে নৌকা তৈরি করে মুহূর্তের মধ্যে সুদূর সন্দ্বীপ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মামলা সংক্রান্ত দলিল এনে আদালতে হাজির করেন। এই অলৌকিক ঘটনার পর তাঁর আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তিনি আদালতের চাকরি ত্যাগ করে লালদীঘির পূর্বপাড়ে একটি নিরিবিলি স্থানে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকেই তাঁর আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।
চট্টগ্রামের লালদীঘির পূর্বপাড়ে প্রতিষ্ঠিত “খানকাহ আমানাতিয়া” ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা ও শিক্ষার কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত জিকির, দোয়া, ধর্মীয় আলোচনা এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা প্রদান করা হতো। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ এই খানকাহে আসতেন আত্মিক প্রশান্তি, দিকনির্দেশনা ও ঈমানের দৃঢ়তা অর্জনের জন্য। অত্যন্ত সরল ও বিলাসবর্জিত জীবনযাপন করতেন তিনি। তাঁর শিক্ষা ছিল–জীবন একটি মহান আমানত, আর সেই আমানতের হক আদায় করা মানুষের প্রধান দায়িত্ব। তিনি সবসময় সৎ উপার্জন, নৈতিকতা, মানবসেবা এবং অন্তরের পবিত্রতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু বাহ্যিক আচার পালনের মধ্যেই ধর্মের পরিপূর্ণতা নেই; বরং অন্তরের বিশুদ্ধতাই প্রকৃত ইসলামের ভিত্তি। তথ্য মতে, হজরত শাহ আমানত (রহ.) তাঁর জীবনের শেষদিকে খানকাহ শরীফের দায়িত্ব তাঁর একমাত্র পুত্র শাহজাদা আনোয়ার খান (রহ.)-এর হাতে অর্পণ করেন। হিজরি ১১৮৭ সালের ১লা জিলহজ তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন করেন। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র শাহজাদা আনোয়ার খান (রহ.) দরবার শরীফের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ১২০২ বঙ্গাব্দের ১১ বৈশাখ একটি ব্যক্তিগত ওয়াকফনামা সম্পাদন করেন। বর্তমানে তাঁর বংশধরগণ ধারাবাহিকভাবে দরবার শরীফের খেদমত পরিচালনা করে আসছেন। হজরতের অসংখ্য মুরিদ ও খলিফা দেশ–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার আজিমপুর দায়রা শরীফের হজরত শাহ সুফী মুহাম্মদ দায়েম (রহ.), আনোয়ারার হাইলদরের হজরত মিয়া হাজী দৌলত (রহ.) এবং মিরসরাইয়ের মস্তাননগরের হজরত শাহ সুফী কিয়ামুদ্দিন (রহ.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘির পূর্বপাড়ে অবস্থিত তাঁর দরবার শরীফ আজও অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী ও দর্শনার্থীর মিলনস্থল। প্রতিদিন মানুষ এখানে আসেন দোয়া, মানত ও আত্মিক প্রশান্তির আশায়।
সাজ্জাদনশীল মোতোয়ালি শাহজাদা শাহিন মিঞা জানান, মাজারে আগত ভক্তবৃন্দের সম্মান ও সেবায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদানের জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। মাজারে প্রতিদিন দুই বেলা লঙ্গরের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবারেও বিশেষ আয়োজন রয়েছে। পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে মাজারে ইফতার–সেহেরি আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও মোনাজাতসহ বিভিন্ন ইবাদত–বন্দেগির আয়োজন থাকে।
হজরত শাহ সুফি আমানত (রহ.)-এর নাম আজ চট্টগ্রামের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর স্মরণে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত সেতু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও আবাসিক এলাকার নাম। এসবই প্রমাণ করে, একজন মহান সাধকের জীবন শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সমাজের চলমান সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। লালদীঘির পাড়ে প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায়, আবার নতুন দিনের সূচনা হয়। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে আলো নিভে যায়নি, তা হলো বিশ্বাস, মানবতা ও আত্মশুদ্ধির আলো।











