শাহানামা মহাকাব্যের অনুবাদক কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ

বদরুননেসা সাজু | বুধবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

পারিবারিক ঐতিহ্যে : মনিরউদ্দীন ইউসুফ বেড়ে ওঠেন এমন এক জমিদার পরিবারে, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি যাদের সীমাহীন অনুরাগ ছিল। আরবী, ফারসী ও উর্দু চর্চার ধারাবাহিক এক সুন্দর পরিবেশ ছিল তাঁদের বাড়িতে। উপমহাদেশের প্রথিতযশা উর্দু কবি খালেদ বাঙালি ঐ পরিবারেই জন্মলাভ করেন। কিশোরগঞ্জের বৌলাই সাহেব বাড়ি থেকে তিনি ‘আখতার’ নামে উর্দু ভাষায় সাময়িকী প্রকাশ করেন। খালেদ বাঙালি সম্পাদিত মাসিক ‘আখতার’ প্রায় অর্ধশতাধিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এই গুণী সম্পাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফের চাচা। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারায় মনিরউদ্দীন ইউসুফ আল্লামা জালালউদ্দীন রুমী, শামসুদ্দীন হাফেজ শিরাজী, মির্জা গালিব, শেখ সাদী এবং আল্লামা ইকবালের লেখার সংস্পর্শে আসেন। বৌলাই জমিদার পরিবারে মুঘল সংস্কৃতির সম্পৃক্ততা ছিল। আবার উর্দুফারসী পারিবারিক রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল তাঁর জমিদার নানা বাড়ি জাওয়ারের পরিবেশ। এ বাড়ির সকলে বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। এখানকার স্কুল লাইব্রেরীর অনেক অনেক বই মনিরউদ্দীন ইউসুফ পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। নানা বাড়ির উদার উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ তাঁর মানস গঠনেও প্রভাব বিস্তার করে। বর্ষাকালে তিনি বজরা কিংবা পানসিতে করে মায়ের সাথে নানা বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। বিশাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত জাওয়ারের জলরাশি দেখতেন। বাতাসের দাপট তখন তাঁর গায়ে এসে লাগতো, যা তাঁর অনুভবে দোলা দিয়ে যেত! ভাদ্র মাসের শুরুতে মাঠ ভরা সাদা জলের খেলা সেখানে নয়ন জুড়ায়। জাওয়ারে নানার সাথে পানসিতে উঠে মনিরউদ্দীন বেড়াতে যেতেন হাওড়ের ওপাড়ের বাজারে। নৌকা ভেসে চলে, তাঁর নানার ঝড়ের মাতন কিংবা যুদ্ধের উন্মাদনার মতো অপূর্ব ঢংকা বাদনে ওই সময় চারদিক প্রকম্পিত হত। এগুলো মনির উদ্দীন ইউসুফের শৈশবের একান্ত ভালোলাগার অংশবিশেষ। পরবর্তীতে ‘আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা (১৯৯২)’ বইয়ের মধ্যে তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যসহ তাঁর জীবন সংগ্রামের চমৎকার আলেখ্য বিধৃত করেন।

প্রবন্ধগ্রন্থ, অতুলনীয় অনুবাদ কীর্তি : অনুবাদ সাহিত্যে মনিরউদ্দীন ইউসুফ (১৯১৯১৯৮৭) এর অসামান্য অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি একাধারে কবি, অনুবাদক, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যের ইতিহাস প্রণেতা। এ ছাড়া মননশীল প্রবন্ধ রচনায় তাঁর সিদ্ধহস্তের পরিচয় পাওয়া যায়, নিম্নলিখিত বই সমূহে। আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮), বাংলা সাহিত্যে সুফি প্রভাব (১৯৬৯), কারবালা একটি সামাজিক ঘূর্ণাবর্ত (১৯৭৯), সংস্কৃতি চর্চা (১৯৮০), আত্মপরিচয় ঐতিহ্যের আলোকে (২০০৩), বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব (১৯৮৪), নব মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৯) ইত্যাদি তাঁর অসাধারণ গ্রন্থ। উর্দু ও ফারসী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্ম থেকে মনিরউদ্দীন ইউসুফ বহু অনুবাদ করেন। এর ফলে বাঙালি পাঠক ও বাংলা অনুবাদ সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়। ইকবালের কাব্য সঞ্চয়ন (১৯৬০), দীওয়ানগালিব (১৯৬৫), কালামে রাগিব (১৯৬৬), গালিবের কবিতা (২০০২), হাফেজের গজল (২০০৯) প্রভৃতি তাঁর মহান অনুবাদ কীর্তি। আরও উল্লেখযোগ্য তাঁর রচিত এবং অনুবাদকৃত রুমীর মসনবী (১৯৬৬), জনশাসনের বিভিন্ন দিক (১৯৬৩) এবং উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৬৮) প্রণয়ণের গ্রন্থসমূহ। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও কলা অনুষদের ডীন মুহম্মদ আবদুল হাই ‘হাফেজের গজল’ এর প্রাককথনে বলেন, “বিশ্বের সাথে সেতু বন্ধনের ক্ষেত্রে অনুবাদের কোন বিকল্প নেই। সৃষ্টিধর্মী অনুবাদ, অনুবাদকের জন্য আত্মশক্তির উদ্বোধন এবং আবিষ্কারও বটে। হাফেজের গজল অনুবাদেও আমরা মনিরউদ্দীন ইউসুফের আত্মশক্তির স্ফূরণ লক্ষ্য করি। বহুভাষী মানব জাতির অন্তর্গত ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্যে অনুবাদ এক অপরিহার্য অবলম্বন। শুধু একে অপরকে বোঝার জন্যে নয়, পরস্পরের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির জন্যে ও অনুবাদ একান্তভাবেই জরুরি। …. বস্তুত মনির উদ্দীন ইউসুফ ছিলেন আধুনিক অর্থে একজন আলোকিত মানুষ।”

মনিরউদ্দীন ইউসুফের অনুবাদকৃত ফেরদৌসীর শাহনামা মহাকাব্য, ৬ খণ্ডের (অনুবাদের) সেট বাংলা একাডেমি ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করে। বাঙলা সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে এটি কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফের অসাধারণ, অতুলনীয় কীর্তি। উল্লেখ্য, তাঁর জীবদ্দশায় শাহনামা ১ম খণ্ড ১৯৭৭, শাহনামা ২য় খণ্ড ১৯৭৯তে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ঐ ৬ খণ্ডে সম্পূর্ণ শাহনামা প্রকাশিত হয়।

অন্যান্য গ্রন্থাবলী : উপরোল্লেখিত প্রবন্ধ সম্ভার এবং অনুবাদকৃত মহামূল্য অতুলনীয় বই সমূহ ছাড়াও এক নজরে মনিরউদ্দীন ইউসুফ রচিত অন্যান্য গ্রন্থসমূহ: কাব্যগ্রন্থ ু উপায়ন (১৯৪১), রাত্রি নয় কলাপী ময়ূর নয় (১৯৭৬), বেতসপাতা জলের ধারা (১৯৮৪), এক ঝাঁক পায়রা (১৯৮৮), মনিরউদ্দীন ইউসুফের অগ্রন্থিত কবিতা ু আবদুল হাই শিকদার সম্পাদিত (১৯৯০), কাব্য সমগ্র বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত (২০০৮)। মনিরউদ্দীন ইউসুফের উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ঝড়ের রাতের শেষে (১৯৬২), পনসের কাঁটা (১৯৮১), ওর বয়েস যখন এগারো (১৯৮৫), উপন্যাস সমগ্রআবদুল হাই সিকদার সম্পাদিত (২০০৩)। মনির উদ্দীন ইউসুফ রচিত নাটকের নাম ঈসা খাঁ (চতুর্থ সংস্করণ২০০৩)। এগুলো ছাড়াও তিনি লিখেছেন চরিত কথা হজরত ফাতেমা (১৯৬৪), হজরত আয়েশা (১৯৬৮), ইসলাম ও মুহম্মদ (সা.) (২য় সংস্করণ২০১১)। তাঁর রচিত কিশোর পাঠ্যসমূহ : ছোটদের ইসলাম পরিচয় (চতুর্থ সংস্করণ২০০২), ছোটদের রসূল চরিত (২য় সংস্করণ২০০১), Iranian Influence in the Aesthetic Aspects of Our Life (২০১২)। মনিরউদ্দীন ইউসুফ এর শিশুতোষ গ্রন্থ মহাকবি ফেরদৌসী (চতুর্থ সংস্করণ২০১০), চলো যাই ছড়ার দেশে (২০০২), এ মনীষী রচিত তাঁর আত্মজীবনীর নামআমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা (২য় সংস্করণ২০১২)

স্মারকগ্রন্থস্মরণিকা : মৃত্যুর দু’বছর পর কবি বেলাল চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ৪০০ পৃষ্ঠার সুবৃহৎ ‘মনিরউদ্দীন ইউসুফ সংকলন’। সংকলন কমিটির পক্ষে সাঈদ আহমদ আনীস কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থে দেশের প্রবীণ, নবীন, বরেণ্য ৯৪ জন কবি প্রাবন্ধিক ঔপন্যাসিক গবেষক অধ্যাপক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী মরহুমের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিচারণ, মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ ও কবিতা লিখেন। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র মিলনায়তনে ১৯৮৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি এই গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় মনিরউদ্দীন ইউসুফ স্মরণিকা। সম্পাদনা করেন কবিপুত্র সাঈদ আহমদ আনীস। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতি হলেন অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। প্রধান অতিথি ড. মফিজ চৌধুরী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কবীর চৌধুরী, সানাউল্লাহ নূরী, গিয়াস কামাল চৌধুরী, সালেহ চৌধুরী, আল মুজাহিদী ও বদরুল আমিন খান। মনিরউদ্দীন ইউসুফের কাব্যগ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করেন আবদুল হাই শিকদার, শামীমা চৌধুরী ও কবি কন্যা অধ্যাপিকা ফাতেমা জেবুন্নেসা।

বিশিষ্ট গুণীজনদের লেখা : মনিরউদ্দীন ইউসুফ সংকলনে তাঁর বন্ধু কবি ও সাংবাদিক সৈয়দ নুরুদ্দিন লিখেন : সাহিত্যে মনিরউদ্দীন ইউসুফের যেটা অক্ষয় কীর্তি সেটা হল ফেরদৌসীর শাহনামা’র অনুবাদ। যে নিষ্ঠা, ভালোবাসা এবং সততা নিয়ে তিনি এই বৃহৎ কাব্যের বঙ্গানুবাদে ব্রতী হয়েছিলেন, তা যে সর্বাংশে সফল হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।….

মনিরউদ্দীন ইউসুফ : বিমুগ্ধ স্মৃতির সৌরভেশিরোনামে সৈয়দ নুরুদ্দিন ঐ সংকলনে লিখেন। সৈয়দ নুরুদ্দিন অনায়াসে বলে যেতে পেরেছেন : ‘বিনয় ভদ্রতাবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সুরুচি। এটা তিনি অর্জন করেছিলেন পারিবারিক পরিমণ্ডল, অধীত বিদ্যা, সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা এবং কিছুটা কাজী আবদুল ওদুদ ও মোহিতলাল মজুমদারের সাহচর্যের মাধ্যমে।’…..আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেন: …. ‘বাঙালির সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির যে অংশটুকু ছিল সর্বোত্তম অর্থাৎ (তার) রোমান্টিক সহৃদয়তা, বেহিসেবী উদারতা, বন্ধুত্বের অকৃত্রিমতা, পরিশীলিত রুচি, উদার আতিথেয়তা প্রভৃতি গুণগুলো তাঁর মধ্যে ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ছিলেন মানবতাবাদে বিশ্বাসী। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ তিনি মনে প্রাণে চাইতেন। তিনি দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গেও আপনজনের মতো মিশতে পারতেন।’

মনিরউদ্দীন ইউসুফ সংকলনে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান লিখেন : ফারসী ভাষায় শাহনামা একটি কঠিন কাব্য। …. এই দীর্ঘ কাব্যের বর্ণনাবৃত্তি কাব্যকৌশলতার দিক থেকে অনন্য সাধারণ। শাহনামা কাব্যটি ৬০,০০০ (ষাট হাজার) শ্লোকের একটি বৃহৎ আয়তনের গ্রন্থ। এই গ্রন্থে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। …. এই অনুবাদ কর্মে মনিরউদ্দীন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

জীবদ্দশায় কবি, সাহিত্যিক অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ বেশ কিছু পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৮), গভর্নর স্বর্ণপদক (১৯৬৮), হাবিব ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮), আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫) এবং সাহিত্যে একুশে পদক– (১৯৯৩, মরণোত্তর) উল্লেখযোগ্য।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,

মহিলা কলেজ চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ