শাশুড়িকে শেখাতে বউয়ের চিঠি চিকিৎসকের কাছে

| বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২৬ at ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

পাশে বসা উনি আমার শাশুড়ি। উনি বাবুকে কোলে নিয়ে ইচ্ছামত দোলায়। আমি মানা করলে আমার আড়ালে গিয়ে দোলায়। বাবুকে মধু খাওয়াতে চাইছে ২ দিন ধরে। দাঁড় করিয়ে প্রস্রাব করাতে চায়। উনার উদ্দেশ্যে কিছু বলুনপ্লিজ’। মাত্র ২ মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে আসা সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরা এলাকার এক নারী লিখেছেন এই চিঠি। সঙ্গে এসেছিলেন ওই নারীর ৬০ বছর বয়সী শাশুড়ি। সীতাকুণ্ডের বার আউলিয়ায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. গিয়াসউদ্দীন টিপু তাঁর চেম্বারে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) এই চিঠি পান। তিনি বলেন, ‘এই মায়ের বুদ্ধি আছে বলতেই হবে। শাশুড়িকে কৌশলে আমার চেম্বারে নিয়ে এসেছেন। ফাইলের মধ্যে খুব সুন্দর করে চিঠিটা দিয়েছেন, শাশুড়ি জানেনই না! ২ মাসের একটা বাচ্চাকে কি ভয়ংকরভাবে লালনপালনের চেষ্টা, সেটা চিঠিতেই স্পষ্ট’। খবর বাংলানিউজের।

চিকিৎসা বিজ্ঞান জানাচ্ছে, এক বছর বয়সের আগে শিশুর মুখে মধু দেওয়া হলে ওই শিশু ‘ইনফ্যান্ট বটুলিজম’ নামে গুরুতর অসুস্থতার সম্মুখীন হতে পারে। নবজাতকের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল থাকে। মধুতে থাকা ক্লোস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া শিশুর বিকাশ প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। অপরদিকে শেকেন বেবি সিন্ড্রোম হলো শিশু নির্যাতনের একটি মারাত্মক ও জীবনঘাতী রূপ, যা প্রধানত ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। এই অবস্থায় শিশুকে জোরে জোরে ঝাঁকানোর ফলে মস্তিষ্ক, চোখ ও ঘাড়ে গুরুতর আঘাত সৃষ্টি হয়, যদিও বাহ্যিকভাবে অনেক সময় কোনো আঘাতের চিহ্ন নাও থাকতে পারে।

শেকেন বেবি সিন্ড্রোম সাধারণত ঘটে যখন কোনো অভিভাবক বা পরিচর্যাকারী শিশুর অতিরিক্ত কান্না, বিরক্তি বা অস্থিরতার কারণে রাগের বশবর্তী হয়ে শিশুকে জোরে ঝাঁকিয়ে থাকে। শিশুদের ঘাড়ের পেশী দুর্বল এবং মাথা শরীরের তুলনায় বড় হওয়ায় ঝাঁকানোর সময় মাথা সামনেপেছনে দ্রুত নড়াচড়া করে। এর ফলে মস্তিষ্ক খুলির ভেতরে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং রক্তনালীগুলো ছিঁড়ে যেতে পারে। সার্ভাইক্যাল স্পাইনের ক্ষতি ও মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আবার ছোট একটা ভুলেই শিশুর হাতে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হতে পারে। শিশুকে হাত ধরে টেনে তোলা, হাঁটার সময় হঠাৎ জোরে টান, হাত ধরে দোল খাওয়ানো, পড়ে যাওয়া আটকাতে জোরে হাত ধরার ফলে কনুইয়ের জয়েন্টে হাতের হাড় (রেডিয়াস) তার স্বাভাবিক জায়গা থেকে সরে যায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, প্রায় ৯ মাস বয়সে শিশু প্রাথমিকভাবে পা ফেলার চেষ্টা শুরু করে। ১০ মাসে আসবাবপত্র ধরে হাঁটতে শেখে। প্রথম জন্মদিনের সময় একজন শিশু কারও সাহায্য না নিয়ে প্রায় ১০ সেকেন্ড একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। শিশু সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ মাস বয়সে একা হাঁটতে শুরু করে। ১৫ মাস বয়সে বেশিরভাগ শিশু দড়ি বাঁধা খেলনা টেনে হাঁটতে পারে, এমনকি কয়েক কদম পেছন দিকেও হাঁটতে পারে। এর আগে থেকে শিশুদের জোর করে দাঁড় করানো থেকে বিরত থাকতে হবে। নইলে শিশুর পা বাঁকা হয়ে যেতে পারে। শিশুরোগ চিকিৎসকরা চেম্বারে আসা অনেক রোগীর কপালে, ভ্রুযুগলে এবং গালে কাজলের ফোঁটা দেখেন। বদ নজর থেকে রক্ষা পেতে এই রীতি এখনও মানছেন কিছু মানুষ। গলায়কোমড়ে বাঁধছেন তাবিজকড়ি। এটার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও বিশ্বাসের ওপর ভর করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এমন প্রথা। কিন্তু গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর তথ্য। বাজারে বিক্রি হওয়া কাজলে পাওয়া গেছে বিপজ্জনক মাত্রার ভারী ধাতুর উপস্থিতি। এগুলো সহজেই শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

নবজাতকের ত্বকে ও চুলে অনেকে শর্ষের তেল মালিশ করেন, যা ক্ষতিকর বলে জানান চিকিৎসকরা। তবে ১৫ দিন বয়স পার হওয়ার পর শিশুর জন্য তেল ব্যবহার করা যাবে বলেও জানান তাঁরা। তেল ব্যবহারে র‌্যাশ বা অন্য কোনও সমস্যা দেখা দিলে সেটি পরিহার করা উচিত। তেল মালিশ করলে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা কমে, এমন ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই। তবে শিশুদের নাকে তেল দেওয়া ঠিক নয়, এতে নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।

ডা. মো. গিয়াসউদ্দীন টিপু জানান, কুসংস্কারের ওপর ভর করে শহরগ্রামের অনেক পরিবার এখনও সন্তান লালনপালন করেন। ফলে সারাবছরই শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এসব কুসংস্কার দূর হবে। পাশাপাশি চিঠি দেওয়া সেই শিক্ষিত নারীর মতো সবাই এগিয়ে এলে শিশুকে নিয়ে পরিবারের ওঝাগিরি কিংবা বৈদ্যের অপচিকিৎসা বন্ধ হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঈদের ছুটিতে সেবা নিশ্চিতে হাসপাতালগুলোর জন্য ১৬ নির্দেশনা
পরবর্তী নিবন্ধসিএমপির এস ড্রাইভ অভিযানে আরও ২৭ জন গ্রেপ্তার