শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা: গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন

ফজলুর রহমান | বুধবার , ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

অলস দেহ, ক্লিষ্টগতি, গৃহের প্রতি টান।’লাইনটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুরন্ত আশা’ কবিতার। এই কবিতার কিসিমের দেহ, গতি কিংবা টান মোটেই মঙ্গলজনক নহে। এতে করে অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখা এবং সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য শারীরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এখন একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহারের চতুর্থ প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসাবে স্বীকৃত। অপর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপ মৃত্যুর ঝুঁকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করে। যা একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বোঝাও তৈরি করে। ১৯৪টি দেশে সামপ্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার বিশ্বব্যাপী বার্ষিক খরচ প্রায় ৪৭.৬ বিলিয়ন ডলার।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক কার্যকলাপ বলতে সাধারণত: কঙ্কালের পেশি দ্বারা সৃষ্ট যে কোনো শারীরিক নড়াচড়াকে বোঝায়, যার জন্য শক্তি ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। শারীরিক কার্যকলাপকে হৃদস্পন্দনের হার ও শক্তি ব্যয়ের মাত্রার ভিত্তিতে নিম্ন, মাঝারি এবং উচ্চ তীব্রতার শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। নিম্নতীব্রতার কার্যকলাপ (যেমন সাধারণ হাঁটা বা গৃহস্থালির কাজ, রান্না করা, বাসন ধোয়া) কিছু উপকার প্রদান করতে পারে, তবে আরও উল্লেখযোগ্য উপকার পেতে মাঝারি ও উচ্চতীব্রতার কার্যকলাপ প্রয়োজন। মাঝারিতীব্রতার কার্যকলাপ (যেমন দ্রুত হাঁটা বা সাইকেল চালান) হৃদস্পন্দনের হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়, আর উচ্চতীব্রতার কার্যকলাপ (যেমন জগিং বা ফুটবল খেলা) হৃদস্পন্দনের হার ৭০ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। উচ্চ তীব্রতার শারীরিক কার্যকলাপের হিসাবে রয়েছে হাইকিং, দ্রুত জগিং, দ্রুত সাইক্লিং, বাস্কেটবল খেলা, ফুটবল এবং একক টেনিস খেলা।

World health organization (WHO)-এর নির্দেশিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি তীব্রতা বা ৭৫ মিনিট উচ্চ তীব্রতার শারীরিক কার্যকলাপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশু এবং কিশোরকিশোরীদের জন্য, প্রতিদিন এক ঘণ্টা মাঝারি থেকে উচ্চ তীব্রতার শারীরিক কার্যকলাপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। WHO অনুমান করে, বিশ্বব্যাপী প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন (২৭ শতাংশ) শারীরিক কার্যকলাপের প্রস্তাবিত স্তর পূরণ করে না এবং ৮০ শতাংশেরও বেশি কিশোরকিশোরী অপর্যাপ্তভাবে সক্রিয়।

সম্প্রতি ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ বাংলাদেশের কিশোরকিশোরীদের শারীরিক সক্রিয়তা বা কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। তাতে দেখা গেছে, গ্রামের কিশোরকিশোরীরা শহরের কিশোরকিশোরীদের তুলনায় শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয়। শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা কিশোরের সংখ্যা বাড়ছে, তবে কিশোরীর সংখ্যা কমছে। ২০১৮ সালে ২৯ শতাংশ কিশোর শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল। ২০২৩ সালে সেই হার বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়। অন্যদিকে ২০১৮ সালে ৫০ শতাংশ কিশোরী শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ৪৩ শতাংশ।

ব্র্যাক জেমস ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ পরিচালিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১২ শতাংশ কিশোরকিশোরী জানিয়েছে, তারা শারীরিক সক্রিয়তার ব্যাপারে পিতামাতার সমর্থন বা সহায়তা পায় না। অন্যদিকে ৭ শতাংশ কিশোরকিশোরী জানিয়েছে, তারা বন্ধুদের কাছ থেকে সহায়তা পায় না। ৭২৬ জন কিশোরকিশোরীর মধ্যে ৫০১ জনের বা ৬৯ শতাংশের ওজন ছিল স্বাভাবিক। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূল ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। স্থূলতা কিশোরদের মধ্যে বেশি।

জরিপের ফল থেকে বুঝা যায়, শারীরিক কার্যকলাপ কমছে নানা কারণে। অথচ শারীরিক কার্যকলাপ, মানসিক এবং সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য গভীর উপকার বয়ে আনে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে। এটি হতাশা এবং উদ্বেগের লক্ষণগুলো হ্রাস করে, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে।

শিশু এবং কিশোরকিশোরীদের সুস্থ বৃদ্ধি এবং বিকাশ নিশ্চিত করতে শারীরিক কার্যকলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শারীরিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ শিশুদের সামাজিকীকরণ, বন্ধুত্ব তৈরি এবং যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম করা শিশুরা পড়াশোনায় আরও ভালো করে, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।

বাংলাদেশে শারীরিক কার্যকলাপে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দ্রুত নগর উন্নয়নের ফলে পার্ক, খেলার মাঠ এবং খোলা জায়গাগুলো মারত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, বিশেষ করে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। উপযুক্ত ফুটপাতের অভাব, যানজটপূর্ণ রাস্তা এবং ভারী যানবাহনের চলাচল জনগণের হাঁটা, জগিং বা সাইকেল চালানকে নিরুৎসাহিত করছে। বিনোদনের জন্য স্ক্রিন টাইম, মোটরচালিত পরিবহণের ওপর নির্ভরতা এবং ডেস্কবাউন্ড চাকরির কারণে বসে থাকা জীবনযাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। স্কুলগুলোতে প্রায়শই শারীরিক শিক্ষাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে, কারণ জিম, খেলাধুলার সুবিধা বা বিনোদনমূলক সরঞ্জামের অ্যাক্সেস নেই অনেকের, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

বাংলাদেশে শারীরিক কার্যকলাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকারি নীতি, সমপ্রদায়ের উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার সমন্বয়ে বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। শহর ও গ্রামাঞ্চলে পার্ক, খেলার মাঠ, পথচারীর সহায়ক ফুটপাত এবং সাইক্লিং লেনের মতো অবকাঠামোতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। এ ধরনের অবকাঠামো শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমভাবে স্থাপন করা উচিত, যাতে সব স্তরের মানুষ শারীরিক কার্যকলাপের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে অংশগ্রহণ করতে সুযোগ পায়। জনসাধারণের স্থানগুলো এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে, যাতে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিরাপদে তা ব্যবহার করতে পারেন। টেলিভিশন, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া এবং কমিউনিটি ইভেন্টস ব্যবহার করে দেশব্যাপী প্রচারণা চালাতে পাওে এবং সক্রিয় থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ফিটনেস ক্লাসের মতো সামাজিকভিত্তিক প্রোগ্রামের আয়োজন করতে হবে। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাধা প্রায়ই নারীদের ব্যায়াম ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। তাই নারীদের জন্য ফিটনেস সেন্টার বা জিম, ক্রীড়া প্রোগ্রাম এবং ব্যায়ামের জন্য নিরাপদ স্থান তৈরি করা দরকার।

স্ক্রিন টাইম এবং বসে থাকা কার্যকলাপ সীমিত করে সারাদিন শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত পারিবারিক হাঁটা বা সাইকেল চালানোর সময়সূচী নির্ধারণ করতে হবে। বাইরে খেলাধুলাকে উৎসাহিত করতে হবে। হাইকিং, সাঁতার কাটা বা একসাথে খেলাধুলার মতো পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবার হিসাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে হবে। পাউরুটি, কোমল পানীয়, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই এবং আচার পরীক্ষা করে দেখা গেছে এগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন উপাদান যেমনঅতিরিক্ত লবণ, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, লেড, ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, এসব খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে।

শারীরিক কার্যকলাপ শুধুমাত্র ফিট থাকা বা ওজন কমানোর জন্য নয়, এটি আমাদের শারীরিক এবং মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। এটি প্রাকৃতিক চাপ উপশমকারী হিসেবে কাজ করে। আজকের বিশ্বে, যেখানে স্ট্রেসের মাত্রা বাড়ছে এবং লাইফস্টাইল রোগ বাড়ছে, শারীরিক কার্যকলাপকে অগ্রাধিকার দেওয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির উদ্যোগ মানে শুধু স্বাস্থ্য ব্যয় নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়াবে ও অসংক্রামক রোগের মহামারি ঠেকাতে সহায়তা করবে। আসুন, সুস্থতার জন্য শারীরিক কার্যকলাপকে অগ্রাধিকার দেই, শরীর ও আত্মার উন্নতির জন্য কাজ করি।

লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)

পূর্ববর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ