শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রভাতফেরি আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরে চট্টগ্রামে পালিত হয়েছে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষা বাংলার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন সেই মহান ভাষা শহীদদের স্মরণে বন্দরনগরীর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে নগরীর কেসিদে রোডের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে।
একুশের প্রথম প্রহরে (রাত ১২টা ১ মিনিটে) শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। সিটি মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, রেঞ্জ ডিআইজি, সিএমপি কমিশনার, মহানগর বিএনপি ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বের সূচনা ঘটে।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। নারী–পুরুষ নির্বিশেষে সবার পোশাকে ছিল শোকের কালো আর সাদার আবহ।
শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন স্থানে দিনটি উপলক্ষে ছিল নানা আয়োজন। জেলা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আলোচনা সভা ও দেশাত্মবোধক গানের আয়োজন করা হয়। শিশুদের মাঝে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দিতে নানা প্রতিষ্ঠানে চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা এবং ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
ভাষার অধিকারের জন্য জীবন উৎসর্গ করা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানগুলো ঘিরে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো ছিল তৎপর। যে–কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) শহরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে। শহীদ মিনার সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে যান চলাচল সীমিত রাখা হয় এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়।
শহীদ দিবসের প্রথম পহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণকালে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। ভাষা আন্দোলনের চেতনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রশাসন, শিক্ষা, বাণিজ্য ও জনজীবনের প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এদিকে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনায় সভায় বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেছেন, ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের চেতনা জাতিকে অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে বারবার রাস্তায় নামতে সাহস জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করে। যদিও উর্দু ভাষার নিজস্ব সাহিত্য ও সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে, তবুও অন্যের ভাষা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নয়, বরং এটি ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার বীজ রোপণের ঐতিহাসিক অধ্যায়। বাংলা ভাষা শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি জাতিসত্তার ভিত্তি। বাংলা ভাষা বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চায় এর ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি সঞ্জয় সরকার বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। জেলা প্রশাসন জানায়, শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জেলা শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক।
দিবসটি উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকেও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সমিতির ৩ নং মিলনায়তনে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুস সাত্তারের সভাপতিত্বে ও সমিতির সহ–সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলুল বারীর সঞ্চালনায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান আলী চৌধুরী, তারিখ আহমেদ, মঈনুদ্দিন, কাশেম কামাল, নজরুল ইসলাম, অনঞ্জন প্রসাদ প্রমুখ।












