শহরের প্রায় প্রতিটি মোড় ঘিরে দিনে রাতে যানজট

ঈদকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরো নাজুক হওয়ার শংক ‘মেডিয়ান গ্যাপ’ বন্ধ করে দেয়ায় উল্টো পথের গাড়ি বাড়াচ্ছে ভোগান্তি

হাসান আকবর | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

মোড়ে মোড়ে গাড়ি, অবৈধ পার্কিং, উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়ি। স্বাভাবিক সময়ের দুর্গতির সাথে এখন যুক্ত হয়েছে মার্কেট ও শপিংমল কেন্দ্রীক যানজট। সবকিছু মিলে এক ভয়াবহ রকমের নাজুক অবস্থায় পড়েছে বন্দর নগরীর যান চলাচল। শহরের প্রায় প্রতিটি মোড় ঘিরে দিনে রাতে যানজট চলছে। যানজট নিরসনে বিশেষ পদক্ষেপ বা ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেয়া না হলে ঈদকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে বলে শংকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে নগর পুলিশ বলেছে, ট্রাফিক পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি মার্কেট ও শপিংমল কেন্দ্রিক বাড়তি লোকজনও মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও নানামুখী সীমাবদ্ধতার কারণে যানজট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে পুলিশ স্বীকার করে।

নগরীর খুলশী থানার সামনে থেকে জামাল খান মোড়ে পৌঁছাতে গতকাল দুপুরে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগেছে। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ আধাঘণ্টার মধ্যে এই দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। গতকাল খুলশী থানার সামনে থেকে শুরু হওয়া যানবাহনের চাপ জামালখান মোড় পর্যন্ত দেখা গেছে। খুলশী ১ নম্বর সড়কের সামনে পুলিশের একটি পয়েন্ট হয়েছে। যেখানে সিগন্যালে জ্যাম হলে তা খুলশী থানা পার হয়ে যায়। অপরদিকে নাসিরাবাদ প্রোপার্টিজের সামনে জিইসি মোড়ের দিক থেকে আসা আলফালাহ গলি, ভূঁইয়া গলি, পূর্ব নাসিরাবাদসহ বিস্তৃত এলাকার গাড়িগুলো ইউ টার্ন নেয়। নাসিরাবাদ উইমেন কলেজ মোড়ের ‘মেডিয়ান গ্যাপ’ বন্ধ করে দেয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়িকে বাড়তি পথ ঘুরে ওখানে ইউ টার্ন নিতে হয়। যা জনভোগান্তির পাশাপাশি ভয়াবহ রকমের যানজট সৃষ্টি করছে।

জিইসি মোড়ের হাউজিং অফিসের সামনে থেকে খুলশী এক নম্বর সড়ক পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় কোনো মেডিয়ান গ্যাপ নেই। এখানে জাকির হোসেন রোডের দুপাশ এবং সন্নিহিত এলাকার হাজার হাজার মানুষকে ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। একইসাথে এই রাস্তায় চলাচলকারী লাখো মানুষকে প্রতিদিনই সকালসন্ধ্যা যানজটের কবলে পড়তে হচ্ছে।

শুধু এ স্থানটিতেই নয়, শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই মেডিয়ান গ্যাপ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে শহরে নয়া আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘উল্টো পথের গাড়ি’। মেডিয়ান গ্যাপ বন্ধ করে নতুন করে যেখানে ইউ টার্ন নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটি মানতে গেলে বেশকিছু পথ ঘুরতে হয়। এই ঘুরতি পথের কষ্ট এড়াতে প্রতিদিনই শত সহস্র রিকশা, ব্যাটারি রিকশা, সিএনজি টেক্সি এবং মোটর সাইকেলের মতো গাড়ি উল্টো পথে চলাচল করে। বিভিন্ন সময় প্রাইভেট কার ও হিউম্যান হলারগুলোকে দেখা যায় উল্টো পথ ধরে সামনে এগুচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই চলাচলে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে দুর্ঘটনা ঘটলেও সবচেয়ে বেশি সংকট সৃষ্টি করছে গাড়ির গতিতে। থমকে থমকে চলতে হয় গাড়িগুলোকে। নগরীর জাকির হোসেন রোড ছাড়াও সিডিএ এভিনিউ, সিরাজউদ্দৌলা রোড, বাকলিয়া এক্সেস রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, পোর্ট কানেক্টিং রোডসহ বিভিন্ন সড়কে উল্টো পথের গাড়ির সংখ্যাধিক্য আতংকের কারণ হয়ে উঠেছে।

গতকাল দুপুরে শহরের জিইসি মোড় থেকে শুরু করে শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তীব্র যানজট দেখা গেছে। ঈদকে সামনে রেখে মার্কেট কেন্দ্রিক যানজট ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কেটগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকায় যানজট তীব্র হয়ে উঠেছে। মার্কেট কেন্দ্রিক নাগরিক ব্যস্ততার জন্য শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো প্রভাবও রাস্তায় পড়েনি। প্রতিটি মোড়ই অগুনতি ব্যাটারি চালিত এবং প্যাডেল রিকশা ও সিএনজি টেক্সি দখল করে রাখে। রাস্তার একটি বড় অংশ দখল করে থাকা রিকশা এবং সিএনজি টেক্সি। এর পাশে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করছে বাস, হিউম্যান হলার। রিকশা, টেক্সি এবং বাসসহ বিভিন্ন গাড়ির ভয়াবহ জটলার পেছনে আটকা পড়ে রয়েছে শত শত গাড়ি। এই দৃৃশ্য শুধু একটি মোড়ের নয়, শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ের। ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন সড়ক ও মোড় কেন্দ্রিক হকার এবং ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেড়েছে। এটাও যানজট পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শেখ মুজিব রোডের রাস্তার অর্ধেক দখল করে চলে গাড়ির যন্ত্রপাতি এবং সাজসজ্জা বিক্রির বেসাতি। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার রাস্তাজুড়ে চলে হরেক পণ্যের বাণিজ্য। জিইসি মোড়সহ সন্নিহিত এলাকার রাস্তার দুপাশে হকারের অসংখ্য দোকান, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, আন্দরকিল্লাহসহ পুরো শহরেরই রাস্তা ও মোড়ের একটি বড় অংশে চলে হকার ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের তৎপরতা। এর পাশাপাশি রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিং করে নিটস্থ মার্কেট কিংবা অফিসে যাওয়ার ঘটনা যান চলাচলের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

শহরের একটি বড় অংশজুড়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি প্রকল্পের কাজের জন্য কাটাকুটি করছে। সিডিএর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের লুব নির্মাণেও শহরের প্রধান সড়কটির বহু জায়গা বেহাল করে রাখা হয়েছে। এতে করে গাড়ি চলাচলের স্পেস ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বন্দর থেকে হাজার হাজার গাড়ি প্রতিদিন নিমতলা থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত সড়কটিতে চলাচল করে। কিন্তু এই সড়কে ওয়াসার একটি প্রকল্পের জন্য রাস্তার বড় অংশ টিনের ঘেরা দিয়ে রাখা হয়েছে। অতি শ্লথ গতির এসব কাজের দরুণ যান চলাচলে স্থবিরতা বিরাজ করছে। রাতে দিনে যানজট লেগে থাকে শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পোর্ট কানেক্টিং রোডে। যার জের ধরে শহরের অন্যান্য রাস্তায়ও যান চলাচলে গতিহীনতা তৈরি হয়েছে। নগরীর বাস স্টেশনগুলোকে ঘিরেও ভয়াবহ যানজট শুরু হয়েছে বলে জানিয়ে সূত্র বলেছে, সমস্যা হচ্ছে কোন একটি স্থানে যানজট শুরু হলে তা দ্রুত আশেপাশের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলেছেন, চট্টগ্রামের যানজট পরিস্থিতি বেশ নাজুক। বন্দর নগরীতে বন্দরকেন্দ্রিক যানজট পুরো বছরই লেগে থাকে। এছাড়া স্কুল কেন্দ্রিক যানজটও মানুষকে বেশ ভোগায়। এখন শুরু হয়েছে মার্কেট কেন্দ্রিক যানজট। শহরের প্রতিটি শপিং মল এবং মার্কেট কেন্দ্রিক যানজট পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলেও তারা জানান। তারা বলেন, অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ চট্টগ্রাম শহরে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ এলাকা রাস্তা থাকার কথা। অথচ চট্টগ্রাম মহানগরীতে রাস্তার পরিমাণ ৯ শতাংশেরও কম। রাস্তার পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি যানবাহনের বেপরোয়া সংখ্যা বৃদ্ধি এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। শহরের প্রধান সড়ক বলতে বুঝায় বিমানবন্দর থেকে শাহ আমানত সেতু কিংবা কালুরঘাট পর্যন্ত রাস্তাটিকে। এশিয়ান হাইওয়ে খ্যাত এই রাস্তাটির কোথাও ছন্দপতন ঘটলে তার প্রভাব শুরু হয় নগর জুড়ে। এছাড়া অলংকার মোড় থেকে ট্রাংক রোড, বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে স্ট্যান্ড রোড, কাপাসগোলা রোড, পোর্ট কানেক্টিং রোড, বায়েজিদ বোস্তামী রোড এগারশ কিলোমিটারের মতো রাস্তা রয়েছে। এর মধ্যে ৬শ কিলোমিটারের মতো রাস্তা পিচঢালা। যেখানে শহরের বেশিরভাগ গাড়িই চলাচল করে। কিন্তু সিস্টেমের অভাবেই দিনে দিনে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো, শহরে দ্রুত অটো ট্রাফিক সিস্টেম চালু করার জন্যও তারা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরী ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা যানজটের কথা স্বীকার করে বলেন, ঈদের মৌসুম, একটু যানজট তো হবেই। তবে শহর যেনো থমকে না যায় সেজন্য আমরা প্রতিটি মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেছি। তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছি। সমিতির পক্ষ থেকে যানজট সামলাতে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও লোকবল বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরী পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, যানজট নিরসনে আমরা অত্যন্ত সিরিয়াসলি কাজ করছি। আমাদের অফিসার এবং ফোর্স এই ব্যাপারে মাঠে রয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে বলে উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, অবশ্যই এর সুফল মিলবে।

মার্কেটকেন্দ্রিক যানজট শহরের অন্যান্য রাস্তায়ও প্রভাব ফেলে বলে উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, আমরা রাতে দিনে কাজ করছি। পরিস্থিতি যেন সহ্যের বাইরে চলে না যায়, মানুষ যাতে ঘরে পৌঁছে ইফতার করতে পারেন সেজন্য আমাদের শত শত পুলিশ সদস্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইফতার করেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত
পরবর্তী নিবন্ধসাবেক এমপি বদির জামিন