শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি

| শনিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ

দেশে ক্রমবর্ধমান শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার নতুন বিধিমালা জারি করেছে। গত মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে। ২০০৬ সালের বিধিমালা বাদ দিয়ে এবার এলাকাভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা, হর্ন ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা, শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার দায়বদ্ধতা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, বিধিমালায় দিনের সময় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা এবং রাতের সময় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ধরা হয়েছে। কোন এলাকায় দিনেরাতে কত মাত্রার শব্দ গ্রহণযোগ্য হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনে ৫০ এবং রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ এবং রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ এবং রাতে ৬০ ডেসিবল, আর শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ এবং রাতে ৭০ ডেসিবল শব্দমাত্রা অনুমোদিত হয়েছে। হর্ন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কড়া করা হয়েছে। অতিরিক্ত শব্দসৃষ্টিকারী হর্ন, হাইড্রোলিক ও মাল্টি টিউন হর্নসহ সহায়ক যন্ত্রাংশ প্রস্তুত, আমদানি, মজুদ, বিক্রি কিংবা বাণিজ্যিক পরিবহন্তকোনোটিই করা যাবে না। মোটরযান বা নৌযানে অনুমোদনহীন উচ্চ শব্দের হর্ন স্থাপন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নীরব এলাকায় কোনোভাবেই হর্ন বাজানো যাবে না। আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ। পটকা, আতশবাজি বা অনুরূপ বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনরাত কোনো সময়েই এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। অন্যান্য এলাকাতেও রাতের সময়ে এ ধরনের শব্দসৃষ্টিকারী বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ। তবে রাষ্ট্রীয়, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবে অনুমতি সাপেক্ষে সীমিত আকারে তা ব্যবহার করা যাবে। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন্তসব জায়গার জেনারেটর ব্যবহারকারীদের শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসে বনভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে; সেখানে লাউড স্পিকার, সাউন্ড সিস্টেমসহ উচ্চ শব্দের উৎস ব্যবহারও বন্ধ থাকবে। সামাজিক অনুষ্ঠান বা বনভোজনের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনেও উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

শব্দ দূষণ রোধে সরকারের এই নতুন বিধিমালা অভিনন্দনযোগ্য। পরিবেশবাদীরা বলছেন, শব্দদূষণ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন একে ‘শব্দসন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করা যায়। অপদস্থ হওয়ার ভয়ে বেশির ভাগ মানুষ কোথাও অভিযোগ না করে নির্বিবাদে উচ্চশব্দের ভয়ংকর যন্ত্রণা সহ্য করছেন। শব্দদূষণ একধরনের মারাত্মক পরিবেশদূষণ। আমাদের সঠিক অনুধাবনের অভাবে দিন দিন এই দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এই ‘শব্দসন্ত্রাস’ আমাদের মাথাব্যথার কারণ। বিশেষজ্ঞরা বললেন, ‘শব্দদূষণের মতো সরব ঘাতক আর নেই। সাধারণভাবে আমরা যে শব্দ চাই না, সেটাই শব্দদূষণ। মানুষ ও প্রাণীর শ্রবণসীমা অতিক্রম করে এবং শ্রবণশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সে শব্দকেই শব্দদূষণ হিসেবে জেনে থাকি।’

দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্সের তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। তার অন্যতম প্রধান কারণ শব্দদূষণ। এই দূষণ এখন রাজধানী বা নগরেই সীমাবদ্ধ নেই, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সমপ্রতি সমন্বিত একটি অংশীদারিমূলক কর্মসূচির আওতায় সারা বাংলাদেশে, বিশেষ করে আটটি বিভাগীয় সদরের শব্দদূষণের পরিমাপ করে। সেখানে দেখা যায়, শব্দদূষণের জন্য মূলত গাড়ির হর্ন সবচেয়ে বেশি দায়ী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশব্দের প্রধান উৎস যানবাহনের অহেতুক হর্ন, ভবন নির্মাণের সামগ্রী, মাইক আর ইট গুঁড়া করার যন্ত্র। তবে সামাজিক অনুষ্ঠানে অতি উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। এতে প্রতিবেশীদের রাতের ঘুম হয় না, হৃদরোগীদের হৃৎকম্পন বেড়ে যায়, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় মারাত্মক ক্ষতি হয়। মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে, গর্ভবতী মা ও শিশুদের ওপর উচ্চশব্দের প্রভাব আরও মারাত্মক। শব্দদূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। আইনকে তারা প্রয়োগ করতে চায় না। নগরীতে নিয়ন্ত্রহীনভাবে চলছে শব্দ দূষণ। তাই শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে