‘শব’ মানে রাত এবং ‘বরাত’ মানে মুক্তি অর্থাৎ মুক্তির রাত, এটা ফার্সি শব্দ। শবে বরাত হলো হিজরি শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত, যা ‘লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান’ নামেও পরিচিত; এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য বিশেষ রহমত ও মাগফিরাতের দরজা খুলে দেন, গুনাহ ক্ষমা করেন, ভাগ্য নির্ধারণ করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, তাই এটি মুক্তির রাত হিসেবে পরিচিত। এই রাতে মুসলমানরা নফল ইবাদত, দোয়া ও তওবা করে থাকেন, এটা “মুক্তির রজনী” নামেও পরিচিত। এই রাতে বান্দাদের জন্য আগামী ১ বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। শবে বরাতের পরের দিন (১৫ শাবান) নফল রোজা অনেকের কাছে জনপ্রিয় আমল। এই রাতে দলবদ্ধ হয়ে ইবাদত এড়িয়ে একা একা ইবাদত করা উত্তম। আল্লাহ তাআলা এই রাতে বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন, মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করেন। অনেক অঞ্চলে এই রাতে তাদের মৃত পূর্ব–পুরুষদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। শবে বরাতে নফল নামাজ পড়া উত্তম। তবে এই রাতে নফল নামাজ পড়ার আলাদা কোনো নিয়ম বা নিয়ত নাই। অন্যান্য নফল নামাজ যেভাবে পড়া হয়, এদিন রাতেও সেভাবে স্বাভাবিক নিয়মে নফল নামাজ পড়তে হবে।
শবে বরাতে যে যে জিকির আযকার করতে হয়: তাহিয়্যাতুল অজু, দাখলুল মাসজিদ, আউয়াবিন, কুরআন তেলওয়াত, তাওবা ইস্তেগফার, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ, তাজবীহ–তাহলিল, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাজবীহ, সালাতুল হাজাত ইত্যাদি আদায় করা। নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো – নামাজ। প্রতিটি নফল ইবাদতের জন্য তাজা ওজু বা নতুন ওজু করা মোস্তাহাব। অত্যধিক নফল নামাজ এই রাতের শোভা বর্ধন করে। শবে বরাতে একজন মুসলিম যেসব ইবাদত করবেন তার পুরোটাই নফল। কোনোটাই ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদাও নয়।
শবে বরাতে বিতর নামাজ: বিতর নামাজ বা বিতর সালাত (সালাতুল বিতর) হলো বিজোড় সংখ্যক রাকআত বিশিষ্ট নামাজ যেটি মুসলিমরা রাতে ইশার নামাজের পর পড়ে। ইশা’র নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময় বিতর নামাজ পড়া যায়। শবে বরাতে বিশেষ কিছু আমল আছে, যা করলে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়। এই রাতের করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া এবং দিনে রোজা রাখা। মহানবী (সাঃ) বলেন যখন শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত আসবে, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে এবং দিনে রোজা রাখবে।
শবে বরাতের নামাজ: প্রতি রাকাতেই সূরা ফাতিহার পর পবিত্র কুরআনের যে কোনো সূরা পড়া। এরপর যথানিয়মে রুকু সিজদাহ করা এবং অন্য রুকনগুলো আদায় করা। এভাবে দু’রাকাত নামাজ শেষ করা। দুই বা চার রাকাত নামাজ শেষ করার পর কিছু সময় দোয়া–দরুদ, তাজবীহ–তাহলিল পড়া, যিকির করা, কুরআন তেলওয়াত করা। এই রাতে স্বাভাবিক নিয়মে দুই রাকাত নফল নামাজের নিয়ত করে সামার্থ্য অনুযায়ী যতক্ষণ ইচ্ছা পড়া যাবে। এই দিন মাগরিব নামাজের পর হায়াতের বরকত, ঈমানের হেফাজত এবং অন্যের মুখাপেক্ষী না হওয়ার জন্য দুই রাকাত করে মোট ৬ রাকাত নফল নামাজ পড়া উত্তম। এশা’র জামাতের পর সারারাত দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করা যায়। শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে যে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন; এই রাতে ইবাদত করলে আর দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন, বিশেষত ইবনে হিববান ও ইবনে মাজাহ এর মত গ্রন্থে এই রাতের মর্যাদা ও ক্ষমা লাভের কথা উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ এই রাতে তার বান্দাদের গুনাহ মাফ করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন মধ্য শাবানের রাত আসে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রাজা রাখো। কারণ আল্লাহ এই রাতে সূর্যাস্তের পর থেকে শেষ রাত পর্যন্ত দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘কেউ কি আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো? কেউ কি আছো যে আমার কাছে রিজিক চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেবো? কেউ কি আছো যে বিপদে পড়েছো, আমি তাকে মুক্তি দেবো? এভাবে ফজর পর্যন্ত তিনি ডাকতে থাকেন।”
লেখক : কবি–ছড়াকার, প্রাবন্ধিক












