আজ ১৪ শাবান মঙ্গলবার দিবাগত রাত পবিত্র শবে বরাত। আল্লাহপাক যে ক’টি রাতকে মোবারক বলে ঘোষণা করেছেন তন্মধ্যে ‘শবে রবাত’ও একটি অন্যতম বরকতময় রাত। ‘শব’ ফার্সি শব্দ। অর্থ– রজনী। ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি, দায়মুক্তি, অব্যাহতি প্রভৃতি। এ রাতে মনে–প্রাণে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত–বন্দেগি করে স্রষ্টার কাছে নিজের গুনাহ ও অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি কবুল করেন এবং অনুতপ্ত বান্দাকে পাপ থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে মাফ করে দেন। হাদিসে ‘নিসফে শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী বলা হয়েছে। এ রাতে আল্লাহপাক বিশ্ববাসীর তাকদীর সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়ের নথিপত্র কার্যকর করার জন্যে ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করেন। যার মধ্যে জন্ম– মৃত্যু, রিজিক, ধন–দৌলত, সুখ–দুঃখ সবকিছুই সন্নিবেশিত থাকে। সুতরাং আজকের রাতটির গুরুত্ব ও মহাত্ম্য বিপুল। এ রাতে আল্লাহপাক মানবজাতির জন্যে নাযিল করেন প্রভূত কল্যাণ ও অসীম রহমত। এ রাত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, এ রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রেখো। কেননা, এ রাতে সন্ধ্যার পর থেকেই আল্লাহপাক প্রথম আকাশে নেমে এসে বলতে থাকেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ আছো কি? যাকে আমি ক্ষমা করবো। কেউ রিজিক প্রার্থনাকারী আছো কি? যাকে আমি রিজিক দেবো। কেউ বিপদগ্রস্ত আছো কি? যাকে আমি বিপদ থেকে উদ্ধার করবো। এমন কি কেউ নেই? এমন কি কেউ নেই? এমনিভাবে আল্লাহপাকের মহান দরবার থেকে আহবান অব্যাহত থাকে সুবহি সাদিক পর্যন্ত। -(সুনান ইব্ন মাজাহ, হাদিস নং– ১৩৮৮)
এ মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন– হে আয়েশা! তুমি কি জানো এ রাতে কি রয়েছে? হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বললেন– ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি বলুন, এ রাতে কি রয়েছে। তখন রাসুল (সা.) বললেন– আগামি বছর যতো আদম সন্তান জন্ম নেবে এবং যারা মারা যাবে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হবে এবং এ রাতে বিশেষভাবে বান্দার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে এবং তাদের রিজিক নাযিল করা হবে। -(মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং–১৩০৫) হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এ রাতে দেখলেন রাসুল (সা.) সিজদায় অবনত হয়ে কাঁদছেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা তুলে বললেন– তুমি জানো এটা কোন রাত? হজরত আয়েশা (রা.) বললেন– না। তখন রাসুল (সা.) বললেন– এটি শাবানের মধ্যবর্তী রাত। এ রাতে যারা যতো বেশি ইবাদত করবে এবং আল্লাহর কাছে মাফ চাইবে তিনি ততো বেশি গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। যদিও গুনাহ্র পরিমাণ পাহাড়সম হয়।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেছেন– এক রাতে আমি রাসুল (সা.)-কে পেলাম না। তখন আমি খুঁজে দেখলাম তিনি জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করছেন। তখন রাসুল (সা.) আমাকে দেখে বললেন– হে আয়েশা! তুমি কি মনে করছো যে, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল তোমার প্রতি অবিচার করেছে? তখন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বললেন– ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আমি ধারণা করেছিলাম আপনি অপর কোনো স্ত্রীর ঘরে গেছেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহপাক নিকটতর আসমানে অবতীর্ণ হন এবং বনি কলব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে অধিক সংখ্যক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন। -(সুনানুত তিরমিজি, হাদিস নং– ৭৩৯)
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এতো দীর্ঘ সময় সিজদা করলেন যে, আমার ধারণা হলো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়লো তারপর তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়িশা! তোমার কি আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না। হে আল্লাহর রাসুল আপনার দীর্ঘ সেজদা দেখে আমার আশঙ্কা হয়েছিলো আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না? তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদেরদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের আপন অবস্থায় ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান, হাদিস নং– ৩৫৫৪)
এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করার ওয়াদা দিয়েছেন; কিন্তু রাতের কোন্ অংশে কবুল করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলেনি। কাজেই আমাদের উচিৎ সারা রাত ধরে আল্লাহর ইবাদতে মাশগুল থাকা। মাগরিবের নামাজ, এশার নামাজ ও ফজরের নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করার পাশাপাশি এ রাতে প্রচুর পরিমাণ নফল নামাজ আদায়, জিক্র–আজকার, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, দান–খায়রাত করা, ফকির–মিসকিনকে খানা দান করা, আমাদের পূর্বপুরুষসহ অসংখ্য আত্মীয়–স্বজন ও প্রিয়জন কবরে শায়িত রয়েছেন তাঁদের জন্য কবর জিয়ারত এবং জীবনের অসংখ্য গুনাহ ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি, ইস্তিগফার, পিতা–মাতা, আত্মীয়–স্বজন, ওস্তাদ ও বিশ্বের সকল মুসলিম–মুসলিমাত ও মুমিন–মুমিনাতের জন্যে দোয়া করা উচিত।
এ রাতে বেশি বেশি করে কুরআন পড়ুন। কুরআন শরিফ তিলাওয়াতের সাওয়াব সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন– যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে ব্যক্তি এর বদলে একটি পুণ্য লাভ করবে। আর একটি পুণ্য হলো দশটি পুণ্যের সমান।-(সুনান আত–তিরমিযী, হাদিস নং– ২৯১০) রাসুল (সা.) আরও বলেছেন– কুরআন তিলাওয়াত শ্রেষ্ঠ ইবাদত। হাদিসের মধ্যে আরো এসেছে– রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন– তোমরা কুরআন পড়ো। কেননা এ কুরআন কিয়ামতের দিন পাঠকারীদের জন্যে সুপারিশ করবে। -(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং– ৮০৪) রাসুল (সা.) অন্য হাদিসের মধ্যে ইরশাদ করেছেন-‘যে ব্যক্তি কুরআনুল করিম অধ্যয়ন করবে এবং তদানুযায়ী আমল করবে কিয়ামতের দিন তাঁর পিতা–মাতাকে এমন একটি মুকুট পরিধান করা হবে, যার জ্যোতি সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪৫৩)
আর এ রাতে বেশি বেশি করে গুনাহ মাপের জন্যে কান্নাকাটি করুন। মানুষ শয়তানের প্রলোভনে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাপ কাজে লিপ্ত হয় এবং অন্যায় অবিচার নির্যাতন ও জুলুম করে থাকে। সমস্ত গুনাহের জন্যে লজ্জিত হয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। হাদিসে এসেছে, কোনো বন্দা নফসের প্রলোভনে ও শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে কোনো গুনাহর কাজ করার পর যদি আল্লাহর দরবারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন– ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ইস্তিগফার করো এবং তাঁরই কাছে তাওবা করো। নিশ্চয় আমার রব পরম দয়ালু ও অতীব ভালোবাসা পোষণকারী।’ -(সুরা হুদ, আয়াত–৯০)
এ রাতে যতো বেশি পারা যায় নফল নামাজ পড়ুন। এতে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তবে জানা থাকলে সুরা ইয়াসিন, সুরা আর–রহমান, সুরা মুলুক, সুরা দুখান ইত্যাদি বড়ো বড়ো ফজিলতপূর্ণ সুরা দিয়ে পড়া ভালো। আর বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করুন।
পরিশেষে বলতে পারি শবে বরাত আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করার রাত। সুতরাং আমরা যেনো এ মর্যাদাবান রাতে অহেতুক সময় নষ্ট করে গল্প গুজবে লিপ্ত না হই। যাতে এ রাতের ভাবগাম্ভীর্যতা ক্ষুণ্ন হয় এ ধরনের কাজ না করি। আল্লাহকে খুশি করার জন্যে সারা রাত ইবাদতে মগ্ন থেকে মুক্তির রজনীর ফজিলত অর্জন করি।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক, প্রফেসর, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।











