শবে বরাত: আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা ও মানবিক জাগরণের রজনী

| মঙ্গলবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ

ইসলামী বর্ষপঞ্জির গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ রজনীগুলোর মধ্যে শবে বরাত এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন রাত। হিজরি শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত: হাদিসের ভাষায় ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শা‘বান’মুসলমানদের জন্য আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার এক অনন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচিত। উপমহাদেশে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী বলা হলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও আচরণের সংশোধনের মধ্যেই।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। হাদিসে বর্ণিত এই ঘোষণা একদিকে যেমন অপরিসীম আশার বার্তা বহন করে, তেমনি অন্যদিকে আমাদের জন্য এক কঠোর আত্মজিজ্ঞাসার বিষয় হয়েও দাঁড়ায়। কারণ এখানে ইবাদতের পরিমাণ নয়, বরং অন্তরের অবস্থা ও মানসিক শুদ্ধতাকে মুখ্য করে দেখা হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা‘বান মাসকে রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং এ মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখতেন। তাঁর সুন্নাহ আমাদের শেখায়, শবে বরাত কেবল একটি রাতের ইবাদতের বিষয় নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক আত্মিক প্রস্তুতির অংশ। রমজান যে সংযম, ন্যায়পরায়ণতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়, শবে বরাত তার পূর্বাভাস ও মানসিক প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়।

বর্তমান সমাজবাস্তবতায় শবে বরাতের শিক্ষা নতুন করে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আজ আমাদের সমাজ নানা সংকটে জর্জরিত। নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন, সহনশীলতার অভাব, মতের অমিল থেকে বিদ্বেষ, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে উদাসীনতা এসবই আমাদের সামষ্টিক জীবনের উদ্বেগজনক চিত্র। এই প্রেক্ষাপটে শবে বরাত আমাদের সামনে একটি আয়না ধরে আমরা ব্যক্তি ও সমাজ হিসেবে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

শবে বরাত উপলক্ষে মসজিদেমসজিদে নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়ামোনাজাত এবং দানখয়রাতের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বলার অবকাশ নেই যে, এই ইবাদতের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তব প্রতিফলনের ওপর। যদি আমরা এই রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, অথচ পরদিনই অন্যের অধিকার হরণ করি, সামাজিক অবিচারকে প্রশ্রয় দিই বা বিদ্বেষ লালন করি, তাহলে সেই ইবাদতের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে শবে বরাত ঘিরে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়, এটি ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। অতিরঞ্জিত আয়োজন, অপচয় কিংবা কুসংস্কার এই পবিত্র রাতের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। ইসলাম কখনোই বাহুল্য ও অপচয়ের শিক্ষা দেয় না; বরং সংযম, ভারসাম্য ও দায়িত্বশীল আচরণই ইসলামের মূল শিক্ষা। শবে বরাতের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

শবে বরাতের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলো ক্ষমা পেতে হলে আগে ক্ষমা করতে হবে। আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করার পূর্বশর্ত হলো মানুষের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা ও ঘৃণা পরিহার করা। আজ যখন ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সহনশীলতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, সামান্য মতভেদ থেকেও বিরোধ ও বিভাজন তৈরি হচ্ছে, তখন শবে বরাত আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় আমরা কি সত্যিই ইসলামের শান্তি ও সমপ্রীতির বাণী ধারণ করছি?

এই মহিমান্বিত রাতে আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত কেবল ব্যক্তিগত মুক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমাজকেন্দ্রিক। ব্যক্তি হিসেবে আমরা যেমন আল্লাহর ক্ষমা কামনা করব, তেমনি সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার জন্যও দোয়া করব। আল্লাহর দরবারে বিনয়ী কণ্ঠে বলতে হবে হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত করো, আমাদের কর্মকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করো, আমাদের সমাজকে অবিচার ও অবক্ষয় থেকে রক্ষা করো।

শবে বরাত কোনো বিচ্ছিন্ন রাত নয়; এটি একটি দায়বদ্ধতার স্মারক। এই রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ধর্মীয় ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক। যদি শবে বরাতের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তবে এই রাত কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়েই থেকে যাবে।

সবশেষে বলা যায় শবে বরাতকে আত্মবিস্মৃতির উপলক্ষ নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্জাগরণের রজনী হিসেবে গ্রহণ করাই সময়ের দাবি। আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা এই রাতের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তবেই শবে বরাত আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সত্যিকার অর্থে আলোর পথ দেখাতে সক্ষম হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে