শত শত একর ফসলি জমি ক্ষত-বিক্ষত

চকরিয়ার হারবাং ছড়ায় এক মাস ধরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন বালুদস্যু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে করা হয় এলাকাছাড়া

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

চকরিয়ার হারবাংয়ের বিভিন্ন স্থানে চলছে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মযজ্ঞ। পার্বত্য অববাহিকার হারবাং ছড়ার তলদেশ, পানি ছিটিয়ে ছড়ার দুই তীর ধসিয়ে দেওয়া এবং বালুকাময় ফসলি জমিতে শক্তিশালী অসংখ্য শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবাধে চলছে বালু উত্তোলন। এতে শত শত একর ফসলি জমি বিরানভূমিতে পরিণত হওয়া ছাড়াও হারবাং ছড়াখালের দুই তীরও অবশিষ্ট থাকছে না। এই অবস্থায় মাত্র ৫০ ফুট প্রস্থের ছড়াখালটি বর্তমানে কোথাও কোথাও ২০০ ফুট প্রস্থে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে। এমনকি বালুদস্যু সিন্ডিকেটের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষের বালুকাময় ফসলি জমিও।

সরজমিন দেখা গেছেউপজেলার উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায় ভয়াবহ এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলছে গত একমাস ধরে। শুধুমাত্র ইছাছড়ি এলাকায় হারবাং ছড়ার তলদেশ, দুই তীর ও বালুকাময় ফসলি জমিতে বসানো হয়েছে অন্তত সাতটি শক্তিশালী শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার। দিনরাত সমানে ভূগর্ভের বালু তোলায় নিয়োজিত রয়েছে অর্ধ শতাধিক শ্রমিক। এতে মানুষের ফসলি জমি, হারবাং ছড়ার তলদেশ ও দুই তীরকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন একাধিক ব্যক্তির ভাষ্যযারা এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তারা এলাকায় বেশ প্রতাপশালী। তাদের দলে রয়েছে চিহ্নিত ও দাগী অপরাধী। তাই এদের কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া তো দূরে থাক, তাদের ক্ষমতার দাপটের কাছে অসহায় মানুষের মুখ খোলারও সাহস নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ফসলি জমির একাধিক মালিক দাবি করেছেন, উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি নামক এলাকায় তাদের সাড়ে তিন একর ফসলি জমি রয়েছে। যে জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন প্রতিবছর। কিন্তু অতি সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নাজিম উদ্দিন ও তার চার ভাইসহ বালুদস্যু সিন্ডিকেট গায়ের জোরে ফসলি জমিতে রাস্তা তৈরি এবং সেখানে শক্তিশালী শ্যালোমেশিন বসিয়ে ভূগর্ভের বালু তুলে বিক্রি করছে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে বাঁধা দিতে গেলে মার খেয়ে চলে আসতে হয়েছে। তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না।

ভুক্তভোগী এই জমি মালিকের ভাষ্যবালুদস্যু নাজিম উদ্দিনের এমন প্রভাব রয়েছে যে এলাকায় তার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে টুশব্দ করারও সাহস নেই কারোর। সেখানে তার বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ করা মানে সপরিবারে এলাকাছাড়া হওয়া। তাই এমন অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এলাকার সচেতন লোকজনও ভয়ে মুখ খুলেন না।

মূলত শক্তিশালী এই বালুদস্যু সিন্ডিকেট পুরো উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, কোরবানিয়া ঘোনা, ভাণ্ডারির ঢেবা, লালব্রিজ এলাকায় পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে চলেছেন। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী দ্বারা পাহারা বসিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে অভিযুক্ত এবং তাদের আশ্রয়প্রশ্রয়দাতারা সকলেই দাবি করেছেনতারা কোনো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারা জেলা প্রশাসন থেকে লিজ নিয়েই বালু তুলে বিক্রি করছেন।

উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরিরত মোহাম্মদ আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার বাড়ি ইছাছড়ি এলাকায় হলেও সেখানে বসবাসের উপযোগী নয় বর্তমানে। কারণ বালু তোলার জন্য বসানো শ্যালোমেশিন ও ড্রেজারের বিকট আওয়াজ দিনরাত সমানে চলছে। এমনকি উত্তোলিত বালু পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত অসংখ্য ডাম্পার গাড়ির আওয়াজ এবং ধুলোময় পরিবেশের কারণে সেখানে বসবাস করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় এলাকা ছেড়ে সপরিবারে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছি।

পার্বত্য অববাহিকার হারবাং ছড়ার ইছাছড়ি এলাকায় ছড়া খাল, দুই তীর ও ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার স্থানটি সরকারি একনম্বর খাসখতিয়ানভুক্ত বলে নিশ্চিত করেছেন হারবাং ইউনিয়ন ভূমিকর্মকর্তা (তহসিলদার) মো. মনসুর আলম। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে দুইটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে তা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে বিদ্যমান। তবে উত্তর ইছাছড়ি নামক স্থান থেকে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে তা ইজারার আওতাভুক্ত নয়। সরজমিন পরিদর্শনপূর্বক সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হবে।

এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব দৈনিক আজাদীকে বলেন, চলমান পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ধরে এখানেওখানে অভিযান পরিচালনা করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অবৈধভাবে বালু তোলায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন সামগ্রী। উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায়ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে।

কঙবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, সরজমিন পরিদর্শনের পর পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে কঙবাজারের জেলা প্রশাসক মো. . মান্নান দৈনিক আজাদীকে বলেন, উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায় যে এভাবে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে তা অবগত ছিলাম না। যারা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট চকরিয়ার ইউএনওকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচন্দনাইশে চন্দন হত্যায় গ্রেপ্তার আরো ২ ডাকাত, মূল হোতা শনাক্ত
পরবর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার