নিজের উপার্জিত টাকায় কিছুদিন আগে নীল রঙের একটি কার (চট্টমেট্রো-গ-০০৫২) কিনেন রিজভী হাসান সাকিব (২৬)। শখের সেই গাড়ি নিজে চালিয়ে গত রোববার দিবাগত রাতে চার বন্ধুসহ রওনা হন কক্সবাজার। কিন্তু গতকাল সোমবার ভোরে লোহাগাড়ার আধুনগরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ জনই। অর্থাৎ শখের গাড়িতেই প্রাণ গেল সাকিবের।
নিহত সাকিব চট্টগ্রামের শিশুসাহিত্যিক ফারুক হাসানের সন্তান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজ থেকে বিবিএ পাস করেছেন। এমবিএতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে গাড়ি চালাতেন। পাশাপাশি সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল সেটের ব্যবসা করতেন। সেখান থেকে অর্জিত টাকা দিয়ে কিনেন গাড়ি।
সাকিবের গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলার চরখানাই এলাকায়। নগরের কোতোয়ালীতে বাসা রয়েছে। সেখানেই বসবাস করতেন। গতকাল মাগরিবের নামাজের পর আন্দরকিল্লায় চট্টগ্রাম ল’ কলেজের সামনে প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দাফনের জন্য পটিয়ার চরখানাই নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে সাকিবের মরদেহ নগরের বাসায় আনা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবাসহ স্বজনরা।
বাবা ফারুক হাসান আজাদীকে বলেন, রোববার রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে সাকিবের সঙ্গে সর্বশেষ মোবাইলে কথা হয়। ওই সময় আমি একটি মিটিংয়ে ছিলাম। সে গাড়িতে গ্যাস ভরার জন্য কিছু টাকা বিকাশে দিতে বলেছিল। তখন যা ছিল তাই দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বাসায় পৌঁছে টাকা দেব। তারপর আর কথা হয়নি।
সাকিব বাসা থেকে কখন বের হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো বাইরে ছিলাম, তাই সঠিক বলতে পারব না। তার মায়ের কাছে শুনেছি সন্ধ্যার পর বের হয়। তার মাকে বলেছিল কঙবাজার যাবে।
আড্ডায় মাতিয়ে রাখতেন দুই বন্ধু : লোহাগাড়া প্রতিনিধি জানান, লোহাগাড়ার আধুনগর বাজার এলাকায় ট্রাক-প্রাইভেটকার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত সাইফুল ইসলাম ও রিজভী হাসান সাকিব দুজনই ছিলেন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের ছাত্র। সম্প্রতি তারা ওই কলেজ থেকে বিবিএ পাস করেছেন। তারা দুজন অন্তরঙ্গ বন্ধু। কলেজ ক্যাম্পাসে বন্ধুদের আড্ডায় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। ক্যাম্পাসে তারা ছিলেন পরিচিত মুখ। পাশাপাশি লেখাপড়ায়ও ভালো ছিলেন। একসাথে দুজনকে হারিয়ে কলেজের বন্ধুদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মোবাইল ফোনে এসব কথা বলেছেন নিহতদের কলেজের সহপাঠী লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা এলাকার মো. শাহাব উদ্দিন। তিনি জানান, সাইফুল মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তার গ্রামের বাড়ি মীরসরাই উপজেলার কমর আলী এলাকায়। সপরিবারে থাকেন নগরীর পাহাড়তলী এলাকায়। প্রায় দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন। রয়েছে এক কন্যা সন্তান। তার পিতা একজন ব্যবসায়ী।
হারুনের স্বপ্নপূরণ হলো না : সামনে রমজান। ঈদের পরে মা-ভাইদের নিয়ে চট্টগ্রাম নগরে বাসা নিয়ে থাকার কথা ছিল দুর্ঘটনায় নিহত হারুনুর রশিদের। নগরীর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য এলএলবি পাস করেছেন তিনি। দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও জেলা পিপি অ্যাডভোকেট একেএম সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। সম্পর্কে তার নাতি। তার বাসায় থেকে লেখাপড়া করেছেন হারুন। তারা ৫ ভাই, ১ বোন। বোন সবার বড়। এরপর হারুনুর রশিদ। এক ভাই সৌদি আরব থাকেন। অন্য ভাইয়েরা পড়ালেখা করেন।
নিহতের ভাই হাবিবুর রশিদ জানান, সপ্তাহখানেক আগে চট্টগ্রাম নগর থেকে বাড়িতে আসেন। ঘটনার দিন রাত ৩টার দিকে বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করেন। রাত ৪টার দিকে পরিবারের সবাই ঘুমে থাকা অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হন। বন্ধুরা আসবে বলে ঘুমাননি। আমিরাবাদ থেকে কারে আসা বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দেন। দূরে কোথাও গেলে মাকে বলে যেতেন। তবে ঘটনার রাতে কোথায় যাচ্ছেন পরিবারের কাউকে বলেননি। ধারণা করা হচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে কঙবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। তার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনিক ক্যাডার হওয়ার।
নিহত হারুনের মা রৌশন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, আমার বুকের ধন হারুন কোথায়? আমার ছেলেকে একটু দেখতে দাও। প্রতিদিন মায়ের হাতের রান্না খাওয়া ও কোলে মাথা রাখার জন্য চট্টগ্রাম নগরে নতুন বাসা নিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমার ছেলের আশা পূরণ করব কী করে? এসব কথা বলতে বলতে জ্ঞান হারান তিনি।












