শংকর

মানবমনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষক ও সময়সচেতন শিল্পী

অরূপ পালিত | শুক্রবার , ৬ মার্চ, ২০২৬ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়সাহিত্যজগতে যিনি ‘শংকর’ নামেই অমর। তাঁর প্রয়াণে বাঙালি পাঠকমন গভীর শোক, মর্মবেদনা ও শূন্যতায় আচ্ছন্ন। দীর্ঘ প্রায় সাত দশকের সাহিত্যসাধনার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি ৯২ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। তাঁর বিদায়ে বাংলা উপন্যাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টিধারা রয়ে গেল অনির্বান,অনশ্বর এক প্রেরণার উৎসরূপে।

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার বনগ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশে) তাঁর জন্ম। পিতা হরিপদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাবর অস্থির সময়ে পরিবারসহ তিনি হাওড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। হাওড়ার অলিগলি, ঘাট, জনারণ্য ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন তাঁর চেতনার ভিত গড়ে দেয়যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে বাস্তবতার দৃঢ় মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করে।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পারিবারিক দায়িত্ব কিশোর বয়সেই তাঁকে জীবনসংগ্রামে অবতীর্ণ করে। ফেরিওয়ালা, টাইপরাইটার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্রাইভেট শিক্ষক, আবার কখনও জুট কোম্পানির কনিষ্ঠ কেরানিএইবহুবর্ণ অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমাজের অন্তঃসলিলা স্রোত চেনায়। মানুষের আশাহতাশা, লোভলালসা, প্রেমপ্রতারণা সবই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে। এই জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যভাণ্ডারের ভিত্তিপ্রস্তুর।

১৯৫০এর দশকের মাঝামাঝি তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা। এক ইংরেজ সাহেব কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ‘নোয়েল ফ্রেডেরিক বারওয়েল’ এর উৎসাহ ও প্রেরণায় তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন। বারওয়েলের অফিসে একটি লাইব্রেরি ছিল। সেখানে নানান ধরনের বই থাকত। বিশ্বসাহিত্যের সাথে শংকরের সেখানেই পরিচয় ঘটে। সেখান থেকেই তিনি আস্তেআস্তে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ডালহৌসি পাড়ায় চাকরির সময় থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর সহকর্মীরাও এই ব্যাপারে তাঁকে খুব উৎসাহ দিতেন। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাসের নাম ‘কত অজানারে’, এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। অল্প বয়সে তিনি এই বইটি লিখে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। এরপর তিনি তার জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি লিখেন।

সেখান থেকেই বাংলা সাহিত্যে এক সম্ভাবনাময় কথাশিল্পীর আত্মপ্রকাশ।

সাহিত্যসাধনা নগরজীবনের মহাকাব্যিক রূপায়নে শংকরের সাহিত্যকীর্তি ব্যাপক, বহুমাত্রিক ও বিষয়বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। নগরসভ্যতার অন্তরাল, মধ্যবিত্ত জীবনের দোদুল্যমানতা, উচ্চাশা ও নৈতিক সংকট, কর্পোরেট সংস্কৃতির কৃত্রিম চাকচিক্য, ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা ও আত্মদ্বন্দ্বএই সমস্ত বিষয় তিনি গভীর বাস্তববোধ, সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ প্রাঞ্জল অথচ তীক্ষ্ণ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।

তাঁর রচনায় একদিকে যেমন রয়েছে সমাজসমীক্ষা, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে মানবমনের সূক্ষ্মতম অনুরণন। তাঁর কলম ছিল প্রখর কিন্তু সহৃদয়, বিশ্লেষণধর্মী কিন্তু হৃদয়গ্রাহী সমালোচনামুখর কিন্তু মানবিকতায় উজ্জ্বল। তিনি সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন, কিন্তু মানুষকে কখনও অবমাননা করেননি, বরং সহমর্মিতার আলোয় দেখেছেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: সৃষ্টির বিস্তীর্ণ ভূগোল চৌরঙ্গী; কলকাতার মহানগর জীবন, বিলাসবহুল হোটেল সংস্কৃতি, অভিজাত সমাজের অন্তরঙ্গ পরিসর ও মানবসম্পর্কের জটিল রসায়ন এই উপন্যাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘চৌরঙ্গী’ কেবল একটি স্থানের নাম নয়; এটি এক চলমান শহরের প্রতীকআলো, অন্ধকার, ভান, ভঙ্গি ও বাস্তবতার সম্মিলন। উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অরুণাভ সিনহা, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা অর্জন করে।

স্যাটা বোস চরিত্রটি আধুনিকতার প্রতীক, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। যিনি কেবল চিফ রিসেপশনিস্ট নন, বরং পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক সুলভ ব্যক্তিত্ব।

সীমাবদ্ধকর্পোরেট জগতের প্রতিযোগিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পদলোভ ও নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম ও বাস্তবচিত্র। আধুনিকতার মোড়কে আত্মবিক্রয়ের কাহিনি এখানে অনিবার্য সত্যের মতো উদ্ভাসিত।

জন অরণ্যবেকারত্ব, মধ্যবিত্তের অস্তিত্বসংকট, সামাজিক অবক্ষয় ও আত্মসম্মানের লড়াই। এই উপন্যাস এক গভীর সমাজবাস্তবতার দলিল।

কত অজানারেঅভিজ্ঞতার অদেখা পরিসর ও আত্মদর্শনের অন্তর্মুখী অন্বেষণ।

একা একা একাশিবার্ধক্য, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও আত্মসমীক্ষার এক সংবেদনশীল সাহিত্যিক দলিল। এই গ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার অর্জন করেন।

এছাড়াও ‘চরণ ছুঁয়ে যাই/ঘরের মধ্যে ঘর/স্বর্গ মর্ত পাতাল/সুবর্ণ সুযোগ/নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি/সোনার সংসার/মানচিত্র/অচেনা অজানা বিবেকানন্দ/রসবতী’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রশংকরের সাহিত্য কেবল পাঠ্যজগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি তা চলচ্চিত্রের পর্দাতেও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জনঅরণ্য’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এই দুই চলচ্চিত্র সীমাবদ্ধ ও জনঅরণ্য বাংলা সিনেমায় অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

এছাড়াও ‘চৌরঙ্গী’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যা দর্শকমনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এই সৃজনশীল সংলাপ বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।

সাহিত্য সম্মাননা ও প্রাপ্তিদীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সম্মানে ভূষিত হন।

২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০১৯ সালে তিনি এক বছরের জন্য কলকাতার শেরিফ পদে মনোনীত হন। ২০২০ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন ‘একা একা একাশি’ গ্রন্থের জন্য।

এ ছাড়া ‘বঙ্গবিভূষণ’ সহ অসংখ্য ছোটবড় সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। সাহিত্যের বাইরে একসময় পশ্চিমবঙ্গেও শেরিফ পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন।

তবে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ছিল পাঠকের অকৃত্রিম ভালোবাসাযা কোনও পুরস্কার বা উপাধির তুলনায় অনেক বেশি স্থায়ী ও মূল্যবান।

শংকর কেবল জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নন; তিনি এক অক্ষয় সাহিত্যঐতিহ্যের নির্মাতা। তিনি ছিলেন সমাজবিশ্লেষক, মানবমনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষক ও সময়সচেতন শিল্পী ও বাস্তবতার নির্মোহ ভাষ্যকার। স্বাধীনোত্তর বাংলার সামাজিক রূপান্তর, নাগরিক জীবনের বিবর্তন, মধ্যবিত্ত মানসের অন্তর্দ্বন্দ্বসবকিছু তাঁর রচনায় প্রামাণ্য ও শিল্পসম্মত রূপ পেয়েছে।

তাঁর প্রয়াণে বাংলা ভাষা হারাল এক প্রজ্ঞাবান স্রষ্টাকে, সাহিত্যভুবন হারাল এক নির্মোহ বিশ্লেষককে। কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো, তাঁর রচিত নগরজীবনের অনুরণন বাঙালির চেতনায় চিরকাল বেঁচে থাববে। এবং তাঁর সাহিত্যধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আলোর দিশারি হয়ে পথ দেখাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধডালিয়া নাছিরের ২০ তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত
পরবর্তী নিবন্ধএনিমেল ফার্ম