বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি কমব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপে খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। ফেভারিট এবং প্রবল প্রতিপক্ষ চীনের বিপক্ষে শুরুতেই চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে আফঈদা–ঋতুপর্ণারা। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে খেই হারায় তারা। পর পর দুটি গোল খেয়ে বসে। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও দ্বিতীয়ার্ধে প্রবল প্রতিপক্ষকে ঠিক ঠেকিয়ে রাখে খেলার শেষ পর্যন্ত। তাতে করে বাড়েনি আর গোলসংখ্যা।
‘বি’ গ্রুপের এই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হেরেছে ২–০ গোলে। তবে বাংলাদেশের সামনেও সুযোগ এসেছিল। ম্যাচের তখন চতুর্দশ মিনিট। প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত এক শট নেন ঋতুপর্ণা চাকমা। বল হাওয়ায় ভেসে ছুটছিল জালের দিকে। চীনের প্রায় ছয় ফুট লম্বা গোলরক্ষক বাজপাখির মতো উড়ে কোনোমতে বল ফিস্ট করে দিলেন ক্রসবারের ওপর দিয়ে। দুর্দান্ত এক গোল পাওয়া হলো না ঋতুপর্ণার। এরপর, প্রথমার্ধের শেষ দিকে উল্টো তাদের দেয়ালে ধরল চিড়। পরপর দুই গোল করে প্রত্যাশিত জয়ে নারী এশিয়ান কাপের শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করে চীন।
এই ম্যাচ ঘিরে সিডনিতে থাকা বাংলাদেশিদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। লাল–সবুজের পতাকা নিয়ে, জার্সি গায়ে জড়িয়ে গ্যালারিতে আসেন অনেকে। এই প্রতিযোগিতায় চীন রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, বর্তমান শিরোপাধারীও তারা। ফিফা র্যাাঙ্কিংয়ে চীন বিশ্বে ১৭তম, এশিয়ায় চতুর্থ। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের রানার্সআপ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এই প্রথম পা রেখেছে এ মঞ্চে। র্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান ১১২তম।
শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে শুরুর একাদশে পোস্টে মিলি আক্তারকে রেখে বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার একটু চমকই দেখান। দুটি নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী এবং গত নারী ফুটবল লিগে খেলা ১০ ম্যাচের সবগুলোতে ‘ক্লিনশিট’ রাখা রূপনা চাকমা এতদিন ছিলেন প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক। তাকে বেঞ্চে রেখে মিলির তরুণ কাঁধে আস্থা রাখেন বাটলার।
চীন শুরুতেই বাংলাদেশকে চেপে ধরার চেষ্টা করে। তাদের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা বাংলাদেশ শুরুতে একটু নড়বড়ে ছিল। চতুর্থ মিনিটে বঙের বাইরে থেকে লিউ জিংয়ের শট দূরের পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। দ্বাদশ মিনিটে বাম দিক থেকে ওয়াং সুয়াংয়ের শট ফিস্ট করে মিলি ফেরানোর পর বল যায় চীনের এক খেলোয়াড়ের পায়ে। তার ফিরতি পাসে ওয়াংয়ের হেড পোস্টের বাইরের দিকে লেগে বেরিয়ে যায়। দুই মিনিট পরই আসে সেই উচ্ছ্বাসে ভেসে ওঠার সম্ভাবনা আর তা বিফলে যাওয়ার হতাশার মুহূর্ত; ঋতুপর্ণার দুর্দান্ত শটটি অনেকটা লাফিয়ে ফিস্ট করে কোনোমতে ক্রসবারের ওপর দিয়ে বের করে দেন চীন গোলকিপার চেন চেন। এই শটে যেন চীন একটু চমকে যায়, পরে রক্ষণেও তারা মনোযোগী হয় কিছুটা।
১৯তম মিনিটে ওয়াংয়ের শট আটকাতে গিয়ে কিছুটা তালগোল পাকান মিলি। তবে বিপদ হয়নি, গড়িয়ে পোস্টের দিকে যাওয়া বল ছুটে এসে ক্লিয়ার করেন দুটি নারী সাফ জয়ী অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজিম। এরপরই উরিগুমুলার শট তড়িৎ পা চালিয়ে আটকে দেন মিলি। কিছুটা অস্বস্তি বোধ করায় মাঠে কিছুক্ষণ চিকিৎসা নিয়ে ফের খেলা শুরু করেন মিলি। এরপরই ২৪তম মিনিটে উরিগুমুলার ক্রসে ওয়াং হেডে বল জালে জড়ালেও, অফসাইডের কারণে গোল হয়নি।
বাংলাদেশের প্রতিরোধের দেয়ালে চিড় ধরে ৪৪তম মিনিটে। সতীর্থের থ্রু পাস ধরে ওয়াংয়ের দৃষ্টিনন্দন কোনাকুনি শট দূরের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায়। মিলি কোনো প্রতিরোধ গড়ার সুযোগই পাননি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের শুরুর দিকে আবারও বাংলাদেশের জালে বল, এবার কিছুটা দূর্ভাগ্যও ছিল সঙ্গী। প্রতিপক্ষের আক্রমণ মিলি ফিস্ট করার পর বল চলে যায় ঝ্যাং রুইয়ের কাছে। তার নিচু শট ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে দিক পাল্টে, মিলিকে বিভ্রান্ত করে জড়ায় জালে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তিন পরিবর্তন আনেন পিটার জেমস বাটলার। শিউলি, উমহেলা মারমা ও নবীরন খাতুনকে তুলে হালিমা খাতুন, স্বপ্না রানী ও তহুরা খাতুনকে নামান তিনি। দলের খেলায় ধার বাড়ে কিছুটা। ৫৯তম মিনিটে ছোট বঙের একটু ওপরে বল পেয়েছিলেন তহুরা, কিন্তু হেড ঠিকঠাক না হওয়ায় বল থাকেনি লক্ষ্যে। ৫৮তম মিনিটে মিলির দৃঢ়তায় ব্যবধান বাড়েনি। ঋতুপর্ণা ও কোহাতি কিস্কুকে কাটিয়ে জোরাল শট নেন ঝ্যাংক। লাফিয়ে আঙুলের টোকায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে বল বের করে দেন তিনি। একটু পর শামসুন্নাহার জুনিয়র এক ডিফেন্ডারের ধাক্কায় বঙে পড়ে গেলে পেনাল্টির দাবি ওঠে, কিন্তু রেফারির সাড়া মেলেনি। বাংলাদেশের জার্সিতে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর অভিষেক ৮৬তম মিনিটে। শামসুন্নাহার জুনিয়রের বদলি নামেন সুইডেন প্রবাসী এই মিডফিল্ডার।
প্রবাসী আনিকা মাঠে নামতেই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘বাংলাদেশ–বাংলাদেশ’ স্লোগানে আওয়াজ তোলেন গ্যালারিতে। দ্বিতীয়ার্ধে দল আর কোনো গোল হজম না করলেও, তহুরা–মনিকারা শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়েন হারের হতাশা নিয়ে। গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে শুক্রবার প্রতিযোগিতার তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ। উজবেকিস্তানকে ৩–০ গোলে হারিয়ে মঙ্গলবার গ্রুপ পর্বে যাত্রা শুরু করেছে উত্তর কোরিয়া। গ্রুপ পর্বে তৃতীয় স্থান পাওয়া তিন দলের মধ্যে সেরা দুই দল পাবে কোয়ার্টার–ফাইনালে খেলার টিকেট। এই সমীকরণ মেলাতে হলে গোল ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সে দিক থেকে উজবেকিস্তানের চেয়ে একটু এগিয়ে থাকার স্বস্তি অন্তত আছে বাংলাদেশের।












