লেবাননে ইসরায়েলের বর্বর ধ্বংসযজ্ঞ, ঝুঁকিতে যুদ্ধবিরতি

হরমুজ প্রণালী দিয়ে দিনে ১৫ জাহাজ যেতে পারবে : ইরান সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের আশপাশ থেকে সেনা সরবে না : ট্রাম্প সবার দৃষ্টি এখন ইসলামাবাদের বৈঠকের দিকে

| শুক্রবার , ১০ এপ্রিল, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

লেবাননে ইসরায়েলের বর্বর হামলায় যুক্তরাষ্ট্রইরান যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংঘাতের ছয় সপ্তাহ পর যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই হামলা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করে তুলেছে। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত ৩০৩ জন নিহত হন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও হত্যা করা হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা ইরানসমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালাচ্ছে।

এই হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমার আশা দেখা দিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, তার সরকারের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির আওতায় সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি বিশেষভাবে লেবাননের কথাও উল্লেখ করেন।

এদিকে গতকাল ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও অগণিত জাহাজকে এ পথে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। দিনে ১৫ টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে, এর বেশি নয়। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানযুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের আগে দিয়ে রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাসকে একথা জানিয়েছেন ইরানের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। যেসব জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে দেওয়া হবে সেগুলোকে ইরানের অনুমতি নিতে হবে এবং বিশেষ প্রটোকল মেনে চলতে হবে।

এই জলপথে জাহাজ চলাচল এখন যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে না বলে জানিয়েছেন ওই ইরানি কর্মকর্তা। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের একপঞ্চমাংশ অশোধিত তেল সরবরাহ হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তেহরান প্রতিটি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এই অর্থ ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হতে পারে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ১ ডলার করে টোল নেওয়া হতে পারে। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে চায় ইরান।

অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যত দিন না সমঝোতা চূড়ান্ত হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত ইরানের আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা সরানোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। ফলে ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি আবার নতুন করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন অনেকে। ইরানকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন ট্রাম্প যে, ওরা (ইরান) হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনও রকম পরমাণু কর্মসূচি করবে না বলেও শান্তি সমঝোতায় বলেছে। কিন্তু সেই সমঝোতা যদি লঙ্ঘন করা হয়, তা হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। আবার হামলা শুরু হবে।

এই অবস্থায় সবার দৃষ্টি এখন ইসলামাবাদের দিকে। সেখানে ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার কথা রয়েছে আমেরিকার। পাকিস্তান আশা করছে, এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি ও পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ এবং আইআরজিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তাও উপস্থিত থাকবেন। প্রসঙ্গত, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানই প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে। তবে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধবিরতি টিকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

ইরানে যুদ্ধের শুরু থেকে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত : গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানের ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার প্রধান আব্বাস মাসজেদি আরানির উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানায়, যুদ্ধে গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ২৫৪ জন শিশুসহ ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। এছাড়াও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১,২২১ জন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছে এবং আরও ৭১৪ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে, যেগুলো শ্রেণিবিন্যাস করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

লেবাননের সঙ্গে দ্রুতই সরাসরি আলোচনা’ : ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি তার মন্ত্রিসভাকে লেবাননের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব সরাসরি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। হিব্রু ভাষায় এঙে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরাসরি আলোচনা শুরুর জন্য লেবাননের কাছ থেকে বারবার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার মন্ত্রিসভাকে এই নির্দেশ দিয়েছেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু জানান, এই আলোচনার লক্ষ্য হবে ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করা এবং ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়ার ঘোষণার আগে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছিলেন, দুইপক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি যুদ্ধবিরতি করাই একমাত্র সমাধান।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআবার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ট্রাম্পের
পরবর্তী নিবন্ধসীতাকুণ্ডে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা