লেখক সম্মেলনে লেখকদের মানস গঠন। লেখক কারা? যারা লিখতে পারে তারাই লেখক। আবার যারা পড়তে পারে তারা পাঠক। লেখক আর পাঠক। লেখক যা লিখে পাঠক তা পড়ে। লেখক লিখে আনন্দ পায়, পাঠক পড়ে আনন্দ পায়। সবাই লেখক হতে পারে না কিন্তু পাঠক হতে পারে। কেউ কেউ লেখক হতে পারে। লিখতে লিখতে লেখক হতে হয়। লেখক হতে হলে আবার পাঠক হতে হয়। লেখক হতে হলে জানতে হয়, শুনতে হয়। তার চেয়ে বেশি পড়তে হয়। জানার জন্য পড়তে হয়। না জানলে লেখা যায় না। এজন্য লেখককে লেখার চেয়ে অনেক বেশি পড়তে হয়। পড়তে পড়তে লেখার জগতে ঢুকতে হয়। নতুন ভাবনার জগৎ। চিন্তা ভাবনার জগৎ। যেখানে লেখক নিজের মতো করে বিচরণ করে। নিজের চিন্তা ভাবনাকে শৈল্পিক রূপ দিয়ে অন্যের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করে। কখনো গল্প কবিতায়, কখনো নাটক উপন্যাসে, আবার কখনো প্রবন্ধ নিবন্ধে। আরো অনেকভাবে লেখক নিজের চিন্তা ভাবনাকে প্রকাশ করতে চায়। অন্যের কাছে তুলে ধরতে চায়।
লেখকের লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হয়। অনেক লেখা পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। আবার অনেকের লেখা পাঠক প্রিয়তা পায় না। এসব লেখকের কেউ কেউ হয়ে ওঠে সৃজনশীল লেখক, কেউ কেউ মননশীল লেখক আবার কেউ হয় জনপ্রিয় লেখক। পাঠকের কাছে লেখা পৌঁছার অন্যতম মাধ্যম বই। লেখাগুলো যখন বই আকারে প্রকাশিত হয়। পত্র–পত্রিকার মাধ্যমেও লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে। এটা খুব সহজ মাধ্যম। পত্রিকায় কোনো লেখা ছাপা হলে সহজে পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। বহুল প্রচারিত অনেক পত্রিকা আছে যেগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিবেদন ফিচার, প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের পাতা, সংস্কৃতির পাতা, অর্থনীতির পাতা আরো নানা ধরনের পাতায় বিভিন্ন লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়। পত্র পত্রিকা শুধু লেখক সৃষ্টি করে না, পাঠক মহলও তৈরি করে। এসব পত্রিকার পাঠকরা শুধু পত্রিকা টিকিয়ে রাখে না লেখকদেরও বাঁচিয়ে রাখে। লেখকদের নতুন লেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
কোনো লেখকের লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশ করা এতো সহজ নয়। লেখক ইচ্ছা করলে প্রকাশ করতে পারে না। প্রকাশক নতুন লেখকের বই প্রকাশ করতে চায় না। তার কারণও অনেক। প্রকাশক বই প্রকাশ করতে একটা বাজেট লাগে। যে কোনো বই প্রকাশ করতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ পড়ে। এ টাকা তুলে আনতে বইগুলো বিক্রি করতে হয়। এ কাজটা খুবই কঠিন। বই সহজে কেউ কিনতে চায় না। লেখক নিজেও বই বিক্রি করতে পারে না। নিজের লেখা বই নিজে বিক্রি করতে কেমন যেন লাগে। যেচে কতো জনের কাছে বিক্রি করা যায়। বইমেলার সময় কিছু বই বিক্রি হলেও অন্য সময়ে তেমন একটা হয় না। এজন্য প্রকাশরা সহজে বই প্রকাশ করতে চায় না। বিশেষ করে নতুন লেখক বা যেসব লেখক পাঠকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। বই মেলায়ও হাতে গোনা কিছু লেখকের বই বিক্রি হয়। যাদের লেখা বই প্রকাশ করতে প্রকাশকরা আগ্রহী হয়ে থাকে। তারপরও অনেক বই প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে বই মেলাকে কেন্দ্র করে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়। এছাড়া লেখকের আংশিক অর্থায়নে কিংবা যে করে হোক সারা বছর বই প্রকাশিত হয়।
যে কোনোভাবে বই প্রকাশিত হলেও পাঠকের কাছে পৌঁছানো এতো সহজ নয়। অপরিচিত লেখকের বই কেউ কিনতে চায় না। এমনিতে অনেকের বই পড়ার অভ্যাস নেই। বই কিনে পড়ার কথাতো ভাবাই যায় না। এটা সেটা অনেক কিছু কিনে কিন্তু বই কেনার মানসিকতা অনেকের থাকে না। বই কেনাকে টাকা অপচয় মনে করে। তবে যারা বই কিনে তারাও দেখে দেখে বই কিনে। পরিচিত লেখকের বই কিনতে চায়। নামকরা লেখকের বই পড়তে চায়। যেসব লেখকের বই আগে পড়েছে সেসব লেখকের বই কিনতে চায়। নতুন লেখকের বই স্টলে পড়ে থাকে। অনেক বইয়ের ভিড়ে চোখেও পড়ে না। মেলায় কোনো কোনো লেখক স্টলে গিয়ে দাঁড়ায়। পাঠক লেখককে দেখলে বই কিনতে পারে। আবার লেখকের কাছ থেকে বইতে অটোগ্রাফও নিতে পারে। এভাবে কিছু কিছু বই পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। তবে বিখ্যাত লেখকদের অনেকে মেলায় যায়। কোনো না কোনো স্টলে গিয়ে বসে। তবে জনপ্রিয় লেখকরা যে স্টলে বসে সেখানে ভিড় জমে যায়। তাদের লেখা বই কিনে পাঠকদের অটোগ্রাফ নেয়ার ভীড়। এরকম দুই তিন জন লেখকের প্রচুর বই বিক্রি হয়। অন্যান্য লেখকের বইও বিক্রি হয়। যারা লেখক হিসাবে নাম করেছে তাদের বই বেশি বিক্রি হয়।
কোনো কোনো লেখকের লেখা পাঠককে টানতে পারে। এদের লেখা একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে রাখা যায় না। আবার এমনো লেখা আছে যার দু’এক প্যারা বা এক পৃষ্ঠা পড়ে পাঠক আর আগায় না। এসব লেখক পাঠকদের টানে না। এজন্য যে কোনো লেখকের লেখা সুপাঠ্য হতে হয়। বেশির ভাগ পাঠক ধৈর্য ধরে কষ্ট করে পড়তে চায় না। পাঠক আনন্দ খুঁজে না পেলে সে লেখা পড়তে আগ্রহী হয় না। পাঠ শুরু করলেও শেষ করে না। লেখককে লেখার মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখতে হয়। পাঠক লেখার মাঝে বৈচিত্র খুঁজে, ভিন্নতা খুঁজে। পাঠক নিজের মন মানসিকতা ও চিন্তা ভাবনাকে লেখার মাঝে খোঁজার চেষ্টা করে। তাই লেখককে পাঠকের কথা মাথায় রেখে লিখতে হয়। পাঠক কি চায়, কি ধরনের লেখা পছন্দ করে তা দেখতে হয়। সমসাময়িক অন্যদের লেখাগুলো লেখককে পড়তে হয়। খুঁজে বের করতে হয় কি রকম লেখা পাঠকেরা পড়তে চায়। সেদিকে লেখকদের মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। তা না হলে এসব লেখা পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে না। পাঠক পড়বে না।
কিছু কিছু লেখা আছে যা পাঠক প্রিয়তা না পেলেও সাহিত্যে স্থান করে নিতে পারে। সে ধরনের লেখার সংখ্যা বেশি নয়। নিরীক্ষাধর্মী কিছু লেখা আছে যেগুলোর আলোচনা সমালোচনা হয়। আবার এমন কিছু লেখা আছে যেগুলোর মাধ্যমে গবেষণা হয়। কেউ কেউ উচ্চতর ডিগ্রির জন্য এ ধরনের লেখার গবেষণা করে থাকে। এসব লেখার পাঠক প্রিয়তা থেকে সাহিত্যমান অনেক বেশি। আলোচনা সমালোচনার মধ্য দিয়ে লেখাগুলো নিজের স্থান তৈরি করে নেয়। এ ধরনের কিছু কিছু লেখা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। খ্যাতিমান এসব লেখকদের লেখা বছরের পর বছর শিক্ষার্থীরা পাঠ করে থাকে। এ ধরনের লেখার সংখ্যা খুবই কম। অনেক যাচাই বাছাই করে লেখা মনোনীত করা হয়। এসব ক্ষেত্রে সব সময় নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হয় না। অনেক ভালো লেখাও পাঠ্য বইয়ে স্থান পায় না। তবে যেসব লেখা পাঠকের মনে স্থান করে নিতে পারে সেসব লেখাই টিকে থাকে। নানাভাবে পঠিত হতে থাকে।
তথ্য প্রযুক্তির এ সময়ে লেখা শুধু মুদ্রিত আকারে প্রকাশ পায় না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কারণে অন–লাইনে অনেক লেখা প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন এ্যাপসের মাধ্যমে মোবাইলে পাঠকের কাছে লেখা অতি সহজে পৌঁছে যেতে পারে। এখানেও পাঠকের লেখাগুলো পছন্দের ব্যাপার আছে। পড়ে দেখার বিষয় আছে। সহজে হাতের নাগালে পৌঁছে গেলেও অনেক লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ থাকে না। লেখককে তার লেখাটি পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হয়। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করতে হয়। মাধ্যম যতোই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হলেও লেখককের অন্যতম লক্ষ্য পাঠক। পাঠক ছাড়া লেখার মূল্য নেই। যতোই ভালো বা মূল্যবান কথাই লেখক লিখুক না কেন তা যদি পাঠক পাঠ না করে তা শুধুমাত্র লেখকের কাছে সীমাবদ্ধ থাকে । যা কোনো লেখক চায় না। সব লেখকই চায় তার লেখা পাঠকেরা পড়ুক। বেশি বেশি করে পাঠ করুক। তাই লেখককের জন্য পাঠক আবশ্যকীয়। এজন্য লেখককে পাঠকের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করতে হয়। তা অন্য কোনোভাবে নয়। একমাত্র লেখার মাধ্যমে, বইয়ের মাধ্যমে। লেখকের একটি লেখা পড়ে পাঠক যেন পরের লেখার জন্য অপেক্ষা করে। পাঠকই বলে দেয় লেখকের লেখা কেমন। তখনই তৈরি হয় লেখক পাঠকের সেতুবন্ধন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী।










