লালদিয়ার চরে অচিরেই শুরু হচ্ছে টার্মিনাল নির্মাণ কাজ

আজ পরিদর্শনে আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল মার্স্ক লাইন বিনিয়োগ করবে ৮০০ মিলিয়ন ডলার

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

নগরীর পতেঙ্গায় প্রস্তাবিত লালদিয়ার চর টার্মিনালের নির্মাণ কাজ অচিরেই শুরু হচ্ছে। ডেনিশ কোম্পানি এ পি মুলারমার্স্ক লাইন ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে টার্মিনালটি নির্মাণ করবে। চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সরকার বিশ্বের শিপিং সেক্টরের মোগল হিসেবে খ্যাত ডেনিশ কোম্পানি এ পি মুলারকে লালদিয়ার চর টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দিয়েছে। ওই জমিতেই টার্মিনাল নির্মাণের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করতে যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বিদেশী কোম্পানিটি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি এপি মুলারমার্স্ক লাইন নির্মাণ কাজ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে আজ একটি প্রতিনিধিদল লালদিয়ার টার্মিনালের নির্ধারিত জায়গা পরিদর্শনে আসছে। একই সাথে প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্গো ও কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমও পরিদর্শন করবে।

সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে স্বীকৃত লালদিয়ার চর। ৫২ একরেরও বেশি জায়গা রয়েছে লালদিয়ার চরে। দীর্ঘদিন এই জায়গা স্থানীয়দের দখলে ছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১৭শ’ পরিবারের কাছে থাকা এ বিশাল জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহির্নোঙর থেকে জাহাজগুলোকে বন্দরের বিদ্যমান জেটিতে পৌঁছাতে দুইটি বিপজ্জনক বাঁক পার হতে হয়। কিন্তু লালদিয়ার চরে কোনো বাঁক নেই। তাছাড়া বিদ্যমান বন্দরে ড্রাফটের যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে। ১ জেটিতে জাহাজ ভিড়ানো বন্ধ রয়েছে। ২ ও ৩ নম্বর জেটিতেও ড্রাফট কম। বন্দরের জেসিবি, সিসিটি এবং এনসিটিতে সাড়ে ৯ মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ বার্থিং দেয়া সম্ভব হয় না। লালদিয়ার চরে বিদ্যমান জেটিগুলোর তুলনায় ড্রাফট বেশি। এখানে ১০.৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে ভিড়ানো যাবে বলেও বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ায় ৪৫০ মিটার টানা জেটি এবং ব্যাকইয়ার্ড নির্মাণের চিন্তাভাবনা করেছিলো। যাতে যে কোনো ল্যান্থের জাহাজ এই জেটিতে ভিড়িয়ে কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা যায়।

লালদিয়ায় একটি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চেষ্টা করে আসছিল সরকার। কিন্তু তাতে সফলতা আসেনি। পরবর্তীতে পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালের (পিসিটি) ব্যাকইয়ার্ড ফ্যাসিলিটি হিসেবে গড়ে তোলারও চিন্তাভাবনা করা হয়। কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করেও বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ায় কোনো টার্মিনাল বা স্থাপনা গড়ে তুলতে পারেনি।

পরবর্তীতে ভারতের আদানি পোর্টস, দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড, ফ্রান্সের বোলোর, চায়না হারবার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক গ্লোবাল পোর্ট সার্ভিসেস লালদিয়ার চরে কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণের আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু তাদের সাথেও আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি।

বছর কয়েক আগে এ পি মুলারমার্স্ক ( মার্স্ক লাইন) বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে (পিসিটি) ইক্যুইপমেন্ট স্থাপন করে অপারেশন শুরু করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পিসিটি সৌদি আরবকে দিয়ে দেওয়ায় এপি মুলারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে হয়।

কিন্তু এবার এপি মুলার লালদিয়ার চরে বড় ধরনের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায়। তারা শুধু টার্মিনালই নির্মাণ নয়, একই সাথে প্রয়োজনীয় সব ইক্যুইপমেন্টও স্থাপন করবে বলে জানিয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তারা যে অবস্থায় বন্দরটি থাকবে সেভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করবে।

বিশ্বের শিপিং সেক্টরের মোগল হিসেবে খ্যাত এ পি মুলারমার্স্ক গ্রুপ চট্টগ্রাম বন্দরে ৮০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। তারা নিজেরাই প্রকল্পটির ব্যাপারে ফিজিবিলিটি স্টাডি করিয়েছে।

দীর্ঘ আলাপ আলোচনা এবং নানা প্রক্রিয়া শেষে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের ব্যাপারে এপি মুলার মার্স্ক লাইনের সাথে চুক্তি করা হয়। ইতোমধ্যে তাদেরকে জায়গাটিও বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। ৪০ বছরের জন্য এপি মুলারকে জায়গাটি দেয়া হয়েছে। এপি মুলার এখানে ৪৫০ মিটার দৈর্ঘের একটি মাল্টিপারপাস জেটিসহ টার্মিনাল নির্মাণ করবে। যেখানে কন্টেনারের পাশাপাশি বাল্ক কার্গোও হ্যান্ডলিং করা যাবে। এই টার্মিনালে যে কোনো ল্যান্থের সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়ানো যাবে বলেও ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এপি মুলার টার্মিনালটি নির্মাণ করে কার্যক্রম শুরু করলে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের শিপিং সেক্টরে ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বন্দরের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ডেনিশ এই কোম্পানিটি বিশ্বের ১১৬টি দেশে ব্যবসা করছে। তাদের বহরে ৮শ’রও বেশি সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে। বিশ্বের আমদানি রপ্তানি পণ্য পরিবহনের অন্ততঃ ১৫ শতাংশ বাজার এককভাবে তারাই পরিবহন করে।

চুক্তি স্বাক্ষর এবং জমি বুঝিয়ে দেয়ার পর এপি মুলার মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরুর প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অচিরেই লালদিয়া টার্মিনালের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, কাজ শুরু করার আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল আজ সকালে লালদিয়া টার্মিনালের নির্ধারিত জায়গাটি পরিদর্শন করবেন। একই সাথে তারা বন্দরের কার্যক্রমও পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। প্রতিনিধি দলে ফার্স্ট কাউন্সিলর এডউইন ককবেক, ফার্স্ট সেক্রেটারি সেবাস্টিয়ান রিগোব্রাউন এবং অ্যাটাশে হুবার্ট বিন্স রয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা বলেছেন, লালদিয়া টার্মিনালে ইউরোপের অনেক বড় একটি বিনিয়োগ আসছে। এতো বড় বিনিয়োগের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল জায়গাটি সরজমিনে দেখে যেতেই এই সফরে আসছে। প্রতিনিধিদলটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন বলেও জানা গেছে।

লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের জন্য দুইটি পৃথক দাগে মোট ৩৯ দশমিক ১৫ একর জায়গা এপি মুলারকে প্রদান করা হয়েছে। এরমধ্যে একটি দাগে ৩২ একর এবং অপর দাগে ৭.১৫ একর জায়গা রয়েছে বলেও বন্দর সূত্র জানিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিয়ের নামে ফাঁদে ফেলে প্রবাসী নারীর ‘কোটি টাকা আত্মসাৎ’
পরবর্তী নিবন্ধবায়েজিদে সিএনজি চালককে পিটিয়ে হত্যা