লাইলাতুল কদর অর্থ ‘সম্মানিত রাত’ ‘মহিমান্বিত রজনী’ ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত’ বা ‘শক্তির রাত’। ফারসি ভাষায় একে ‘শবে কদর‘ বলা হয়। পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলির একটি, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম এবং এই রাতে পবিত্র কুরআন মজিদ নাজিল হয়েছিল। এ রাতে ইবাদত করলে সারা জীবনের গুনাহ মাফ হতে পারে। এ রাতে ফেরেশতারা অবর্তীর্ণ হন এবং শান্তির বার্তা নিয়ে আসেন। এ এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের (প্রায় ৮৩ বছর ৪মাস) ইবাদতের চেয়ে বেশি সওয়াব। মাহে রমজানের ২১, ২৩, ২৫,২৭ বা ২৯ তারিখের রাত (বিজোড় রাত) হিসেবে ধরা হয় ,তবে ২৭ তম রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশির ভাগ মানুষ মনে করে থাকেন। রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না। নাতিশীতোঞ্চ হবে অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না মৃদু বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে, এ রাতের যেকোনো আমলই হাজার মাসের আমল থেকে শ্রেষ্ঠ। লাইলাতুল কদরে আমাদের কর্তব্য হলো বেশি বেশি নিজের জন্য আত্মীয় স্বজনদেরও জন্য দোয়া করা, আল্লাহপাক তা কবুল করেন। লাইলাতুল কদর উপলক্ষে আমাদের করণীয়ঃ (ক) কদরের ফজিলত পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু নফল ইবাদত করা, নফল নামাজ আদায় করা, কোরআন তেলাওয়াত করা, তাছবীহ তাহলীল পাঠ করা কর্তব্য। দুই দুই রাকাআতে নফলের নিয়তে যে কোন সুরাই সুরা ফাতেহার সঙ্গে মিলিয়ে নামাজ পড়া যাবে। উত্তম হলো নফল নামাজ ধীরে সুস্থে লম্বা লম্বা ক্বেরাত দিয়ে পড়া এবং ধীরেস্থিরে রুকু–সিজদা আদায় করা। (খ) লাইলাতুল কদর রাতের শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো– ক্ষমা চাওয়ার দোয়া, এ রাতে মহানবী (সাঃ) ক্ষমা চাওয়ার দোয়া শিক্ষা দিলেন যে, তুমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও, ক্ষমা পাওয়ার জন্য দোয়া করো। হাদীস শরীফে আছে হযরত আয়েশা (রাঃ) মহানবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ! যদি আমি বুঝতে পারি শবে কদর কোন রাত, তাহলে ঐ রাতে আমি কী বলব? আল্লাহর কাছে কী চাইব? প্রিয়নবী (সাঃ) তদুত্তরে বলেন তুমি বলবে, হে আল্লাহ আপনি বড়ই ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতে আপনি ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ আরবি দোয়া হলো– ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা, আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া, ফাওফু আন্নি।’ কেউ যদি জীবনে অনেক কিছু পায় কিন্তু ক্ষমা না পায়, তাহলে জীবন ব্যর্থ। তাই এ রাতে অন্তরকে নরম করে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার পুর্বে খাঁটি দিলে তওবা ইস্তেগফার করতে হয়। খাঁটি তওবার চারটি শর্তঃ (১) পূর্বের গুনাহ থেকে ফিরে আসা বা গুনাহ ছেড়ে দেয়া; (২) গুনাহর জন্য মনে মনে অনুতপ্ত হতে হবে যে, আমি বড়ই অন্যায় করেছি,
৩। ভবিষ্যতে ওই গুনাহ আর করবো না বলে মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে হবে;
৪) বান্দাহর কোনো হক নষ্ট করে থাকলে যথাসাধ্য সে হক আদায় করে দিতে হবে।
(গ) এ রাতের আরেকটি আমল ফুকাহায়ে কিরামগন বলেছেন যে, এ রাতে ইবাদতের পূর্বে যদি কেউ গোসল করে নিতে পারে, তার সেটাই উত্তম। আমলগুলো শুধু ২৭ রমজান নয় বরং রমজানের শেষ দশ দিনের প্রত্যেক বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করতে হবে। এজন্য মহানবী (সাঃ) রমজানের শেষ দশ দিনে ইতেকাফ করতেন, আর উম্মতের জন্য শরীয়তে ইতেকাফের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত জারি রেখে গিয়েছেন যেন তারা ইতেকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব দিয়ে প্রত্যেকটি বিজোড় রাতে ইবাদত করতে পারেন।
এ রাতের মর্যাদা মূল্যায়ন তখনই যথার্থ হবে যখন আমরা কুরআনের নির্দেশিত পথে চলবো আর কুরআনের বাহক মুহাম্মাদ (সাঃ) এর পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য করবো। এ রাতের সর্বাপেক্ষা মহৎ প্রাপ্তি হলো কুরআনের হক আদায় করা এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে কুরআন প্রদর্শিত পথে পরিচালিত করার জন্য নিজেদেরকে সর্বদা প্রস্তুত করা। সুরা আল কদরঃ পবিত্র কুরআনের ৯৭ তম সূরা, যাতে ৫টি আয়াত রয়েছে এবং এটি মক্কায় অবতীর্ণ। এই সুরায় লাইলাতুল কদরের মাহাত্ন্য, কুরআন নাজিল ও এই রাতের ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। লাইলাতুল কদরে বেশি বেশি নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাওবা ইস্তেগফার, তাসবিহ পাঠ, সালাতুত তাজবিহ, তাহাজ্জুদ আদায় করা উত্তম। লাইলাতুল কদরের নামাজের বিশেষ কোন নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। লাইলাতুল কদরের রাতে দুই রাকাআত করে নফল নামাজ যত সুন্দর ও মনোযোগ সহকারে পড়া যায় ততই উত্তম, দুই রাকাত দুই রাকাত করে যত খুশি পড়া যায়। শবে কদরের নফল নামাজের জন্য বিশেষ কোনো আরবি নিয়ত আবশ্যক নয়, মনে মনে সংকল্প করাই যথেষ্ঠ।
আল্লাহ যেন সবাইকে লাইলাতুল কদর তালাশ করার তৌফিক দান করেন সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিকও এনায়েত করেন, আমিন।
লেখক : কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক।










