চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ লাইটারেজ জাহাজে ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের সংকটে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) থেকে জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় তেলের অভাবে সেগুলো বহির্নোঙরে যেতে পারছে না। ইতোমধ্যে বেশ কিছু জাহাজ বহির্নোঙরে অলস অপেক্ষা করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কয়েকদিনের মধ্যে বহির্নোঙর এলাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের আমদানি বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজার সরবরাহ নেটওয়ার্কে। বন্দর ও জাহাজ মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের উপর বহির্নোঙরসহ দেশের পণ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি নির্ভর করে। চট্টগ্রাম বন্দরে আগত বড় জাহাজগুলোর একটি বড় অংশ ড্রাফটের কারণে সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে। পরে ছোট আকারের লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করে তা বন্দরের জেটি কিংবা দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরে পাঠানো হয়। বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভরশীল। বহির্নোঙরের এই কার্যক্রম দেশের সমুদ্রবাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বছরে শত শত মাদার ভেসেল বহির্নোঙরে অবস্থান করে পণ্য খালাস করে।
কিন্তু সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে বিপাকে পড়েছে লাইটারেজ বহর। একটি লাইটারেজ জাহাজ প্রতিদিন পরিচালনায় গড়ে তিন হাজার থেকে দশ হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল প্রয়োজন হয়। আগে ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত এই জ্বালানি পাওয়া গেলেও বর্তমানে সরবরাহ কমে গেছে। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো রেশনিং করার ফলে অনেক জাহাজ প্রয়োজনীয় তেল না পেয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, জ্বালানি ডিপোগুলো আগের মতো ডিজেল দিচ্ছে না। এমনকি নদীপথে তেল সরবরাহকারী ট্যাংকার ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না। একজন লাইটারেজ জাহাজ অপারেটর বলেন, আগে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যেত এখন তার অর্ধেকও মিলছে না। অনেক জাহাজ বরাদ্দ পেয়েও মাদার ভেসেলের কাছে যেতে পারছে না। তারা বলেন, আমরা মজুদ বা পাচার করার জন্য তো তেল চাচ্ছি না। আমাদের জাহাজ চালানোর প্রয়োজনীয় তেল চাচ্ছি। কিন্তু সেই তেল না দিয়ে কার্যত আমাদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল থেকে নিয়ম অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেক জাহাজ তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারছে না। এতে বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত পাশাপাশি জাহাজজটেরও আশঙ্কা বাড়ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বহির্নোঙরে প্রতিদিন অসংখ্য লাইটারেজ জাহাজ পণ্য পরিবহনে কাজ করে। এসব জাহাজের মাধ্যমে খাদ্যশস্য, সার, কয়লা, ক্লিংকার, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বন্দরের কার্যক্রম নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
শিপিং ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত ডেমারেজ বা জাহাজ ভাড়া গুণতে হবে। এতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারমূল্যের উপর পড়বে।
বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক হাজী সফিক আহমেদ বলেন, বহির্নোঙরের কার্যক্রম পুরোপুরি লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভরশীল। এই জাহাজগুলো চলতে না পারলে বন্দরের অর্ধেক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দ্রুত জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে কয়েকদিনের মধ্যে বহির্নোঙর এলাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম সংকটে পড়তে পারে। এতে দেশের আমদানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বাজার সরবরাহ থেকে শুরু করে সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।












