রেলওয়ের কলোনিতে বছরের পর বছর বহিরাগতদের বসবাস

কলোনির ভেতরে শুধু বাসা নয়, অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে দোকান, গুদাম

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ at ৪:৫০ পূর্বাহ্ণ

নগরীর টাইগারপাস ও পাহাড়তলী রেলওয়ে কলোনিতে চার ক্যাটাগরিতে মোট ৫ হাজার ৩২৯টি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য ১৫৩টি, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য ২৩৭টি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ২ হাজার ২৫৫টি ও চতুর্থ শ্রেণির জন্য ২ হাজার ৬৮৪টি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ বাসাতেই থাকেন না রেলের কর্মকর্তাকর্মচারীরা। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টাইগারপাসপাহাড়তলীকদমতলীআইসফ্যাক্টরি রোডজান আলী হাট স্টেশনের রেলওয়ের স্টাফ কোয়ার্টার ও কলোনির বেশির ভাগ বাসায় বসবাস করছেন বহিরাগতরা। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার তাদের দখলে রাখা বাসা অন্যদের ভাড়াও দিচ্ছেন। রেলওয়ে বিষয়টি জানলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বছরের পর বছর।

নিজের নামে রেলওয়ে থেকে বাসা বরাদ্দ নিয়ে সেই বাসায় না থেকে বাইরের লোকের কাছে ভাড়া দেয়াটা অন্যায়। এরকম কেউ করলে তার বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাওয়ার কথাএমনটা জানিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মাহাবুব উল করিম। তিনি বলেন, রেলওয়েতে বেশির ভাগ স্টাফ নিজের জন্য বাসা বরাদ্দ নিয়ে নিজে থাকেন না। সেটা বাইরের লোকের কাছে ভাড়া দেন। যাদেরকে ভাড়া দিয়েছেন তারা যখন ভাড়া দেয় নাতখন আমাদের কাছে এসে বলেন অবৈধ ভাবে তার বাসা দখল করে রেখেছেউচ্ছেদ করা জন্য। আবার অনেকেই নিজের বাসার সামনের খোলা জায়গায় বাসা করে ভাড়া দেয়। বাইরে যেগুলো অবৈধ ভাবে বসবাস করে সেগুলো উচ্ছেদ করা যতটা সহজ; কিন্তু কোয়ার্টারের ভেতরের খোলা জায়গায় যেসব বাসা তৈরি করে ভাড়া দেয়া হয়েছেসেগুলো উচ্ছেদ করা একটু বিব্রতকর। তবে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। রেলের জায়গায় তো বাইরের কেউ অবৈধ ভাবে থাকতে পারে না।

এদিকে সরেজমিনে নগরীর টাইগারপাসে নেভি কনভেনশন হলের পাশ দিয়ে রেলওয়ে কলোনিতে ঢুকে একটু এগুতেই চোখে পড়ে বাসা ভাড়া দেয়ার বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপনে দেয়া একটি নম্বরে ফোন করলে অপর প্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ করে মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি পরিচয় জানতে চান! বাসা ভাড়ার জন্য ফোন করেছিবলার পর ওই ব্যক্তি বলেন, একটি পাকা বাসা দুই রুমের। পাশে টিন শেডের রান্না ঘর ও টয়লেট আছে। মাসে ভাড়া ৯ হাজার। আর দুটি সেমি পাকা বাসা আছে তিন রুমের করে। মাসিক ভাড়া ৭ হাজার করে। বিদ্যুৎ বিল এবং গ্যাস সিলিন্ডার আলাদা।

তিনি রেলের স্টাফ কিনা জানতে চাইলেওই ব্যক্তি বলেন, রেলের এক স্টাফের পক্ষ থেকে তিনি এসব দেখাশুনা করেন। তিনি রেলের এক কর্মচারীর কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিয়েছেন। সেই বাসা এখন আবার তিনি নিজে ভাড়া দিচ্ছেন।

পাহাড়তলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেলের স্টাফদের প্রতিটি কোয়ার্টারের সামনে আঙিনার খালি জায়গায় অবৈধভাবে সেমিপাকা এবং কাঁচা টিন শেড ঘর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে অবৈধভাবে বিদ্যুতের সংযোগও নেওয়া হয়েছে। পাহাড়তলীতে রেলওয়ে বিভাগীয় ম্যানেজারের দপ্তরের এক কর্মচারীর কোয়ার্টারের সামনে এবং আরএনবির এক ইন্সপেক্টরের কোয়ার্টারের সামনে ১০ থেকে ১৫টির বেশি ঘর করে ভাড়া দেয়া হয়েছে। আরএনবির ওই ইন্সপেক্টর আরো বহু জায়গা দখল করে অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।

পুরো সিআরবির আশপাশে আরএনবির সদস্যরা কয়েকশ ভাসমান দোকান বসিয়েছেন। ভাসমান কয়েকটি ফুচকাচটপটি ও চায়ের দোকাদারের সাথে কথা হলে তারা জানান, প্রথমে বসার সময় সিআরবি ফাঁড়ির আরএনবির ইন্সপেক্টর, হাবিলদারদের একটি মোটা অংশের টাকা দিতে হয়েছে। এরপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় সবাইকে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হয়। তিনজনে মিলে এই টাকা তুলে বলে জানান দোকানদাররা। এখানে দোকান ভেদে টাকার হারও ভিন্ন বলে জানান তারা।

অপরদিকে টাইগারপাসের রেলওয়ে কলোনির ১৪ নম্বর ভবনের ১/বি বাসায় পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে ভাড়া আছেন এক মহিলা। তিনি বলেন, বাপ্পি নামের রেলের এক কর্মচারীর কাছ থেকে বাসাটা ভাড়া নিয়েছি। এক যুগের বেশি এই ভবনে ছিলাম, কোনো সমস্যা হয়নি। এখনো আছি।

রেলের এক কর্মচারীর কাছ থেকে মাসে ১০ হাজার করে ভাড়া নিয়ে ৩ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার একটি কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকছেন কদমতলী রেল লাইনের পাশের এক ভাসমান চা বিক্রেতা। এর মধ্যে দুইটি কক্ষ আবার সাবলেটও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমি রেলের এক কর্মচারী আত্মীয়। তবু কোয়ার্টারটা ভাড়া নেয়ার সময় তাকে এক লাখ টাকা অগ্রিম দিতে হয়েছে।

এসব বাসা ভাড়া দেয়ার সময় ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে এককালীন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে নেন রেলওয়ের কর্মচারীরা। মাসপ্রতি ভাড়া ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। সালাম নামে এক ভাড়াটিয়া বলেন, এখানে খোলামেলা পরিবেশ। চারদিকে গাছপালা ঘেরা, যোগাযোগ সুবিধাও ভালোতাই এখান থেকে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। ভাড়াটিয়া সালাম বলেন, বাসার মালিক আসেন না। মাস শেষে মালিকের মোবাইলের বিকাশ নম্বরে ভাড়া পাঠিয়ে দিই। বাসার মালিক আবার কলোনির আঙিনার খালি জায়গাতেও অবৈধভাবে কাঁচাপাকা ঘর, দোকানপাট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান তিনি। সেখানে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও নেয়া হয়েছে অবৈধভাবে।

আইস ফ্যাক্টরি রোডের পাশ ঘেঁষে রেলওয়ে কলোনিতে তিল ধারণের জায়গা খালি নেই। কলোনির ভেতরে শুধু বাসা নয়, দোকান থেকে শুরু করে অফিস, গুদাম, বিউটি পার্লার, কোচিং সেন্টার করে অবৈধ ভাবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। মোবাইল রিচার্জ, বিকাশ এবং স্টেশনারির এক দোকানদার বলেন, গত ১০ বছর আগে তিনি দোকনটি ভাড়া নিয়েছিলেন রেলের এক স্টাফের কাছ থেকে। তখন তিনি দেড় লাখ টাকায় নিয়েছিলেন। ভাড়া ছিল তখন ৫ হাজার টাকা। গত দুই বছর আগে তার কাছ থেকে আরো ৫ লাখ টাকা অগ্রিম জামানত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। ভাড়া এখন ১০ হাজার টাকা দিতে হয় বলে জানান। এরকম প্রায় ৩০৩৫টি দোকান আছে আইস ফ্যাক্টরি রোডের রেলওয়ে কলোনিতে। ওই দোকানদার বলেন, যার কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি তিনি জানিয়েছেন, কেউ উঠাতে পারবে না। নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন, আমি তো আছি।

অবৈধ জেনেও সরকারি কোয়ার্টারে বাসা ভাড়া কেন দিচ্ছেন, জানতে চাইলে টাইগারপাস রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টারের তিন নম্বর বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলার রেলের ৫৫ বছর বয়সী আবদুল হক নামে এক কর্মচারী আজাদীকে বলেন, কোয়ার্টারে সুযোগ সুবিধা তেমন ভালো না। তারপরও সামনে কিছু জায়গা খালি পড়ে আছে। তাই তিনটি ঘর করে ভাড়া দিয়েছিমাসে মাসে সেখান থেকে কিছু পাই। তা দিয়ে মোটামুটি ছেলেমেয়ে পরিবার নিয়ে কোনো রকমে চলি। আবদুল হক বলেন, শুধু আমি না রেলের ৮০ শতাংশ স্টাফ তাদের বাসাবাড়ির সামনের জায়গায় ঘর করে ভাড়া দেন। এটা কর্তৃপক্ষও জানেন। আমরা তো চুরিডাকাতি করছি না! নিজের বাসাবাড়ির সামনের জায়গায় পরিচিতজনদের থাকতে দিয়েছিমাসে মাসে কিছু আয় হয় সেটাই!

এদিকে সরেজমিনে নগরের জান আলী হাট স্টেশনের রেলওয়ের সরকারি কোয়ার্টার গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র! প্রতিটি স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে বহিরাগতদের ভাড়া দেওয়া হয়েছে। প্রায় স্টাফ কোয়ার্টারে রেলের স্টাফ নেই; ভাড়াটিয়া। এছাড়া কলোনির আঙিনার খালি জায়গায় অবৈধভাবে কাঁচাপাকা ঘর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সেখানে অবৈধভাবে বিদ্যুতের সংযোগও নেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের প্রকৌশলী বিভাগের একটি তালিকায় দেখা গেছে, জান আলী হাট রেল স্টেশনের কর্মকর্তাকর্মচারীদের বাসা রয়েছে ৪৪টি। তার মধ্যে ৯টি পরিত্যক্ত ও সিলগালা করা, ৩০টি বাসাতে অবৈধ দখলদাররা বসবাস করছেন। বাকিগুলো স্টাফদের নামে বরাদ্দ।

এ ছাড়া কলোনির আঙিনার খালি জায়গায় অন্তত ৫০টি অবৈধ ঘর নির্মাণ করে ভাড়া বাণিজ্য চলছে। এছাড়াও জান আলী হাট থেকে শুরু করে কাপ্তাই রাস্তার মাথা হয়ে কালুরঘাট পর্যন্ত রেল লাইনের দুইপাশে অবৈধ ভাবে কাঁচা বাজার বসানো থেকে শুরু করে দোকান বসিয়ে এই স্টেশনের আগের মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার এবং আরএনবির সদস্যরা মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বাসা ভাড়া, কাঁচা বাজার বসানো, দোকান বসানো সবটাই এই স্টেশনের আগের মাস্টার, সহকারী স্টেশন মাস্টার এবং আরএনবির তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে।

সরেজমিনে কাপ্তাই রাস্তার মাথা গেটের পাশে সরকারি কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা যায়, একতলা ৮টি বাসায় বহিরাগতরা বসবাস করছেন। আশপাশে থাকা খালি জায়গায় টিন দিয়ে আরও ১৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোতেও ভাড়াটিয়া রয়েছে।

স্টেশন ভবন সংলগ্ন কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী স্টেশন মাস্টারের নামে বরাদ্দ বাসাটিতেও বহিরাগতরা বসবাস করছেন। এ ছাড়া খালি জায়গাতে অন্তত ৩০টি বাসা তৈরি করে সেগুলোও ভাড়া দেওয়া হয়েছে। কালুরঘাট সেতুর পাশে সরকারি কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি একটি বাসায় অবৈধভাবে বসবাস করছেন কালুরঘাটের অস্থায়ী গেটম্যান। বাকি বাসাগুলোতে বহিরাগতরা বসবাস করছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, আগের স্টশন মাস্টার এবং সহকারী স্টেশন মাস্টার ও আরএনবির সদস্যরা রেলের এসব দোকানপাট, খালি জায়গা ও বাসা ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ টাকা আয় করছেন। জান আলী হাট রেল স্টেশনের সরকারি বাসাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে রেলওয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় প্রকৌশলী১ এর কার্যালয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা নিরুপায়। বাসা ভাড়া দেয়ানেয়ায় একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রশ্রয়ে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড করে আসছে। অবৈধভাবে ভাড়া দেয়া এসব বাসায় পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও অবৈধভাবে দেয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআল্লাহর নি’আমতের শুকরিয়া আদায় করা ইবাদত
পরবর্তী নিবন্ধমশার মাধ্যমে ১৪ কোটি মানুষকে ডেঙ্গু থেকে রক্ষার চেষ্টায় ব্রাজিল