রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে

| রবিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:১১ পূর্বাহ্ণ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশচীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিএফসিসি) কার্নিভাল হলে আয়োজিত ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬ : জাতীয় নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রত্যাশা’ শীর্ষক খসড়া ইশতেহার উপস্থাপন সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। এ সংলাপের আয়োজন করে প্রাপ্তি ও সংলাপ সহযোগীর সহায়তায় সিপিডি।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে তাদের প্রধান দায়িত্ব হবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব কাঠামোয় রূপান্তর করা। বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল জাতির লক্ষ্য। তবে পাঁচ দশকের পথচলায় নানা উত্থানপতন, আশানিরাশার মধ্য দিয়ে দেশ এগোলেও আর্থসামাজিক উন্নয়ন রয়ে গেছে অসম ও ভঙ্গুর। বিশেষ করে গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ফলে গভীর শাসনসংকট সৃষ্টি হয়েছে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে বৈষম্যকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জবাবদিহিতা সুশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুশাসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সেবাদানকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। জবাবদিহিতা বলতে বোঝায় দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি ও দায়দায়িত্বের স্বীকারোক্তি। জবাবদিহিতার সঙ্গে মানবাধিকার যুক্ত। জবাবদিহিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবের জন্য দায়ী কিছু বিষয় আছে। এগুলো হলো প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল সংসদ, অনুন্নত রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব এবং দুর্বল নির্বাচন ব্যবস্থা। স্বাধীনতাপরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত কয়েকটি সংসদে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। এ কারণে সংসদ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারছে না। স্বৈরশাসনও জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে আঘাত হেনেছে। তাছাড়া আমলারা অনেক সময় জনগণের সামনে সত্য তথ্য প্রচার করতে চায় না। শাসকশ্রেণিরও একটি অংশ তথ্য গোপনের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এই অস্বচ্ছতা দুর্নীতির জন্ম দেয় এবং সুশাসনের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দুর্বল হলে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় খাতকে প্রভাবিত করে। সামাজিক জবাবদিহিতা হলো নাগরিক, সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং পরিষেবা সরবরাহকারীদের আচরণ ও কার্যকারিতার মধ্যে সুদৃঢ় মিথস্ক্রিয়া। যেখানে সরকার, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা সবাই ন্যায়নৈতিকতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে সমপ্রদায়ের কল্যাণ এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করে। তাঁরা বলেন, প্রশাসনে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীদের জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করার জন্য জবাবদিহিতার ক্ষেত্রকে উন্মুক্ত করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ বা বিভাগীয় জবাবদিহিতার মাধ্যমে যথাযথ শুদ্ধাচারের আচরণ পরিলক্ষিত হয় না। কারণ এতে কর্মকর্তার কর্তব্যে অবহেলা, অর্পিত দায়িত্ব প্রতিপালনে ব্যত্যয় হলে কিংবা দোষত্রুটির জন্য আইনানুগ সাজার পরিবর্তে যোগসাজশে রফাদফা করার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একজনের দোষ অন্যজনের ওপর চাপানোসহ গুরুদোষে লঘুদণ্ড দেয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। ঘটতে পারে ক্ষমতার অপব্যবহারও। মনে রাখতে হবে, সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারীরা রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রদেয় কর ও বিভিন্ন ফিঅর্থ থেকে বেতনসহ প্রদেয় সুযোগসুবিধাদি ভোগ করে থাকেন। তাই তাদের জবাবদিহিতাও জনগণের কাছে হওয়া উচিত।

জবাবদিহিতার মাধ্যমেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই নয় বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের জবাবদিহিতাও আবশ্যক। দুর্নীতি কমাতে ও রাজনৈতিক উন্নয়নে জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা ছাড়া যেমন গণতন্ত্রকে পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষা করা যায় না, তেমনি গণতন্ত্র না থাকলে সুশাসন ও জবাবদিহিতাকেও প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে