রামাদান ও আল্‌-কোরআন-এক অবিচ্ছেদ্য অংশ

ডা. মোহাম্মদ ওমর ফারুক | শুক্রবার , ৬ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবী সৃষ্টির পরপরই মহান রাব্বুল আ’লামিন আরবী মাসগুলো সুবিন্যাস করেছেন। বারটি মাসের মাঝে সবচেয়ে দামি মাস মাহে রমজান। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিতাব, মহাবিশ্বের মহাগ্রন্থ পবিত্র আল্‌ কোরআনে আল্লাহতায়ালা শুধুমাত্র রমজান মাসকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন, ‘রোজার মাস (এমন একটি মাস)- যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এ (কোরআন হচ্ছে) মানবজাতির জন্যে পথের দিশা, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী’ সূরাবাকারা১৮৫। লাখো হরিণের মাঝে একটি হরিণের মৃগনাভিতে রয়েছে সুগন্ধিযুক্ত কসু্তরি, যে কস্তুরির জন্য হন্যে হয়ে প্রাণপণ ছুটে যায় শিকারীরা, তেমনি এই মাসে গর্ভধারণ করেছে সেই মহিমান্বিত ও সম্মানিত কিতাবযেটির আবেদন আগামী কিয়ামত পর্যন্ত অরক্ষিত থাকবে। আর তা হল আল্‌কোরআন। এই মাসের মহত্ত্ব ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি শুধুমাত্র কোরআন নাযিলের কারণে। এই কোরআন আসেনি শুধুমাত্র তেলওয়াতের জন্য, ইছালে সওয়াবের জন্য, কোরআনখানি করার জন্য কিংবা কোরআন খতম করার জন্যএটি এসেছে হেদায়াতের অমিয় বাণী সমগ্র মানবজাতির দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য, কোরআনের বিধানকে আল্লাহর জমিনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। নির্দিষ্ট কোন বর্ণ কিংবা গোষ্ঠীর জন্য আসেনি কোরআন। পৃথিবীর সমস্ত বর্ণ, ধর্ম, গোষ্ঠী, অঞ্চল জাতিগত নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য একমাত্র জীবন বিধান হিসাবে এসেছে শ্রেষ্ঠ দামি কিতাব আল্‌কোরআন। মানবজীবনের পরতে পরতে সৃষ্ট সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করা ও তা নিরসন করার সমাধান রয়েছে এই মহান কিতাবে। এই কোরানের চর্চা ও বিশ্লেষণ আজ সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি আর এই দাবী অগ্রাহ্যের কারণে ইতিহাসের আস্তাখুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষেরা। জীবন থেকে যেন চলে না যায় এবারের রমজান, সেদিকে যেন আমাদের দৃষ্টি থাকে অবিরত। কি পেলাম আর কি হারালাম সেটি বিবেচনার সময় এসেছে এখন। আগামী বছরের রমজান মাসটি আমাদের ভাগ্যে জুটবে কিনা সেটি জানেন একমাত্র মহাপ্রশংসিত সত্তা মহান রাব্বুল আ’লামিন, যাঁর হাতে নিবদ্ধ আমাদের জীবন ও মরণ। এই মোবারক মাসটি ফাঁকি দিয়ে চলে গেল আমাদের জীবন থেকেতা টেরই পেলাম না। জীবনের প্রতিটি পদে পদে রমজান মাসের গুরুত্ব গেঁথে দিয়েছি কিনা, সেটির পরিচর্যা ও পর্যালোচনার সময় এসেছে এখন। যে ব্যক্তি এ মহান মাসটি হাতের কাছে পেয়েও তা সঠিকভাবে জীবনের সর্বত্র প্রয়োগ করতে পারেননি তার মতো হতভাগা আর কে হতে পারে? এ মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নেয়ামত, নেয়ামতের শোকরগুজার না করলে আল্লাহতায়ালা কেড়ে নেন। রমজান মাসের নেয়ামত পেয়েও যারা কদর করেননি রমজান মাস তার উপর লানত দেয়। যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল অথচ গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে তো চরম হতভাগা। এ মাসের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব হচ্ছে মাবুদের কাছে গুনাহ মাফ চাওয়া। এ মাসের শেষ দশকের এক মর্যাদাপূর্ণ বেজোড় রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযিল হয়েছে বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর উপর। সেজন্যেই এ মাসের মর্যাদা এতো বেশি। আল্লাহতায়ালা বলছেন, ‘তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে শবে কদর অন্বেষণ কর’। হযরত মা আয়েশা রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল (সাঃ) এই মর্যাদাপূর্ণ শবে কদরের রাতে আমি আল্লাহর কাছে কি চাইব? জবাবে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন, এ রাতে শুধু গুনাহ মাফ চাইবে। সিয়ামকিয়াম, ইফতারের পূর্বে সব জায়গায় রয়েছে গুনাহ মাফের অপূর্ব সুযোগ। রাসূল (সাঃ) এর সামনেপেছনের সব গুনাহ আল্লাহতায়ালা মাফ করে দিয়েছেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), আপনার তো জিন্দেগীর সব গুনাহ মাফ তবুও কেন এতক্ষণ নামাজে দাঁড়িয়ে থাকেন? তিনি বলেন, আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হব না? বিশ্বনবীকে জিজ্ঞেস করা হল : দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে দামি অংশ কোনটি? আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন, রাতের শেষ অংশরাত যখন তিন ভাগের এক অংশ বাকী থাকে তখন আল্লাহতায়ালা গুনাহ মাফের জন্য বান্দাদের ডাকতে থাকেন। প্রত্যেক রাতের শেষ অংশে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতায়ালা সপ্তম আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, আমার কাছে দোয়া কবুলের কেউ আছো নাকি? আমি আল্লাহতায়ালা দোয়া কবুলের জন্য হাজির হয়েছিসুবহানাল্লাহ্‌। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছো? সন্তানসন্ততি, ধনসম্পদ ইত্যাদি। হযরত কাতাদাহ (রাঃ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, তোমাদের আব্বাদের রাত কিভাবে যেতো? ওমর (রাঃ) বলেন, রাত যখন শেষের দিকে তখন আমাদের আব্বাদের চোখের ঘুম হারাম হয়ে যেত। এ বিশাল আকাশে গ্যালাক্সি রয়েছে চল্লিশ হাজার কোটির উপরে। গ্যালাক্সির ভেতর লুকিয়ে থাকে লক্ষ কোটি তারকা, যেগুলোর আকার সূর্যের চাইতে লক্ষগুণ বড় আর সূর্য পৃথিবীর চাইতে ১৩ লক্ষ গুণ বড়। এ বিশাল তারকারাজির কসম খেয়ে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরানুল করিমের বিশালতাকে বুঝিয়েছেন এভাবেই, ‘আমি শপথ করছি তারকাগুলোর অস্তাচলের’সূরা আল ওয়াক্বেয়াহ৭৫’। যেটার প্রতিটি বর্ণ এসেছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেযেখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহতায়ালা সূরা ইউনুছ এ বলেন, তামাম জিন্দেগীর দিনগুলোকে যদি ঈদ বানানো হয় তবুও কোরআন পাওয়ার ঈদ শেষ হবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, পৃথিবীর সমস্ত সোনারুপাহীরা এক করলেও পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের সমানও হবে না। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাইবেল বিশেষজ্ঞ ড. ক্যাম্পবেলকে উদ্দেশ্য করে বিখ্যাত পারস্পরিক ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. জাকির নায়েক বলেন, তোমার কিতাবের ঊনচল্লিশ পয়েন্টের মধ্যে এক একটি পয়েন্টের ভুল সংশোধনের জন্য সারা জিন্দেগীর হায়াত শেষ হয়ে যাবে তবুও ভুল সংশোধন করতে পারবে না। তুমি আল্‌কুরআনুল করিমের আঠারটি পয়েন্টের ভুল ধরেছ আর আমি সাথে সাথে তার জবাব দিয়েছি। হেদায়াত আল্লাহতায়ালার কাছে। আর কোরআন হেদায়াতের কিতাব। ব্রিটিশ পন্ডিত ড. নিকলসন বলেন, পবিত্র কোরআনে এক হাজারের উপর বিজ্ঞানের আয়াত রয়েছে এবং এর জের, জবরের মধ্যেও ব্যাকরণ রয়েছে। তিনি বলেন, আল্‌ কোরআন শব্দের এক ভয়ংকর অভিধান আর এতে রয়েছে উন্নতমানের সাহিত্যের পান্ডিত্য। আমার পান্ডিত্য মধ্যাহ্ন সূর্যের কাছে জোনাকির আলো। এটি হলো আইন ও প্রশাসনের বিশ্বকোষ। আফ্‌সোস এ মোশরেক ব্যক্তির কাছে আমরা মুসলমানরা পরাজিত কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন কোরআনের বিশালতা আর আমরা অভাগারা বুঝতে পারিনি এখনো কোরআনের শান, কোরআনের মর্যাদা আর কোরআনের বিশালতা।

কোরআন এসেছে দুটি ম্যাসেজ নিয়ে। আর তা হল : জালেমদের জন্য দুঃসংবাদ আর নেক্‌কারদের জন্য সুসংবাদ। কোরআনের দাবি হল : ) পুরো কোরআন পাঠ ২) কোরআন জানাবুঝা আর এটি ফরজ ৩) এটির প্রত্যেক বর্ণের উপর ঈমান আনা ৪) এ কিতাব যেটা হারাম করেছে সেটা মানা এবং জিন্দেগীর প্রতিটি পদে পদে এটির অনুসরণঅনুকরণ করা। এ কিতাবের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে সমগ্র পৃথিবীর আনাচেকানাচে, প্রতিটি অণুপরমাণুতে আর প্রতিটি মানুষের হৃদয়পটে।

লেখক: সভাপতিরাউজান ক্লাব, সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), রাঙ্গামটি জেনারেল হাসপাতাল

পূর্ববর্তী নিবন্ধউড়াল দিচ্ছি চাঁদে
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা