রাজনীতির বলি ক্রিকেট: বিশ্বকাপে নেই বাংলাদেশ

সালাহউদ্দিন শাহরিয়ার চৌধুরী | শুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির কারণে ৩ জানুয়ারি ভারতের উগ্রবাদীদের হুমকি ও প্রতিবাদের মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স, যা বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের মাটিতে, টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দল ভারতে যাবে না বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ঘটনা দক্ষিণ এশীয় ক্রিকেটে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলনও ঘটেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াসহ চারিদিকে বিভিন্ন স্তরে পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সকল সদস্য দেশের সাথে আলাপ করে ধারণা নেওয়া উচিৎ ছিল। আইসিসির সভায় বাংলাদেশের পক্ষে কতগুলো ভোট আসবে অন্তত ৭/৮টি ভোট পেলে আইসিসি হয়তো বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার সুযোগটা পেতো না। সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ না করে বিসিবি অনেকটা হার্ড লাইনে চলে যায় যেখানে মোস্তাফিজ ইস্যু থেকেও বেশি কাজ করেছে আঞ্চলিক রাজনীতি। তারা বল নিজেদের কোর্টে না রেখে ঠেলে দেয় সরকারের দিকে। আর সরকারও দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ক্রিকেটের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে আঞ্চলিক বিরোধকে। অবশ্যই এক্ষেত্রে বিসিবি অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে। যেহেতু প্রায় ১৫০ কোটির মত জনসংখ্যার দেশ ভারত যেখানে ক্রিকেট সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা এবং ক্রিকেট থেকে বিজ্ঞাপন সহ নানাভাবে আইসিসির আয়ের অন্যতম শক্তি ভারত। তাই ভারতের প্রতি আইসিসির দুর্বলতা অনেক বেশি, তাই ভারতে না খেলার বিষয়ে বাংলাদেশের যুক্তিযুক্ত কারণ থাকলেও বাংলাদেশের আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, যা পূর্বেই অনুমিত ছিলো।

বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিশ্চয় এমন একটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শঙ্কার মধ্যে পড়বে। কারণ এ বিষয়ে আইসিসির সভায় বাংলাদেশ পাকিস্তান ছাড়া অন্য সহযোগী রাষ্ট্র থেকে খুব একটা কারো সমর্থন পায়নি। মোস্তাফিজের মতো একজন খেলোয়াড়কে হুমকি প্রকাশ্যে দেওয়া হলো, দল থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো কিন্তু আইসিসি তাদের বিরুদ্ধে কোনও রূপ ব্যবস্থা নিলো না, তাহলে কিসের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেখানে খেলতে যাবে। ক্রিকেট বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো ইচ্ছে হলেই যে কোনও দেশে নানা অযুহাতে না খেলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন সেটি আইসিসির নির্ধারিত সফর হলেও কিন্তু আইসিসি এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। বৃহৎ শক্তিগুলো আইসিসির তোয়াক্কা করে না বলে অন্য দেশের আত্মসম্মান বোধে আঘাত লাগবে না এমন কিন্তু নয়। কোনও দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হলেও একজন খেলোয়াড় সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অংশ হতে পারে না, অথচ অনেক সময় সে দেশের খেলোয়াড়কে এর জন্য অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়তে হয়। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সবকিছুই হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অন্য দেশের প্রতি নতজানু ভূমিকার কারণে তাই দিন দিন তাদের ভূমিকা এমনই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে নির্ধারিত ভেন্যুতে বা দেশে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনা নতুন নয়, ২০২৫ সালের মার্চে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। ফলে ভারতের ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আয়োজন করা হয়। ইংল্যান্ডের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি না হওয়ায় ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায় জিম্বাবুয়ে। ২০০৩ জিম্বাবুয়ের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের প্রশাসনের বিরোধিতা করে দক্ষিণ আফ্র্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবুয়েতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে নাইরোবিতে বোমা হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়ে নিউজিল্যান্ড কেনিয়ায় খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ ও টুর্নামেন্টের আগে দেশটিতে বোমা হামলার ঘটনার জেরে ১৯৯৬ ওয়ানডে বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়।

ক্রিকেট বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ এবারের বিশ্বকাপে না খেলায় বড় রকমের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে, কারণ বিসিবির বার্ষিক আয়ের প্রায় ৬০% শতাংশ আসে আইসিসি থেকে যা হারাতে পারে বাংলাদেশ। এমনকি সঙ্গে ২০২৮ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছরের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এছাড়া বিসিবির আয়ের মোটা একটা অংশ আসে সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি ও স্পনসরশিপ থেকে কিন্তু বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না খেলার ফলে বিসিবির সাথে সাথে ক্ষতির মুখে পড়বে অফিশিয়াল সম্প্রচারক ও বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানসমূহ। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলে বাংলাদেশ প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অংশগ্রহণ ফি পেতো কিন্তু অংশগ্রহণ না করায় সেটিও পাবে না ফলে বিসিবিসহ খেলোয়াড়রাও সম্মুখীন হবে আর্থিক ক্ষতির, হারাতে পারে সামনের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার সুযোগ। নিষিদ্ধ বা জরিমানার মতো শাস্তির মুখেও পড়তে পারে বাংলাদেশ এমনটিও অসম্ভব নয়। যদিও ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স এসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ) বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী টম মোফাট বলেন, ক্রিকেট তখনই সবচেয়ে শক্তিশালী যখন প্রতিটি দল ও প্রতিটি খেলোয়াড়কে সম্মান করা হয় এবং ন্যায্য শর্তে সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত থাকে, তাই বিশ্বকাপের বাংলাদেশের অনুপস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক।

বর্ণবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক আচরণ, দুর্নীতি বা ক্রিকেট বোর্ডের উপর হস্তক্ষেপের জন্য পূর্বে সাউথ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো আইসিসি, কিন্তু পরবর্তীতে সে দেশগুলো স্বমহিমায় আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। হয়তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে বাংলাদেশ এখনো খুব শক্তিশালী হয়ে উঠেনি অথবা আর্থিক বা নানা বিষয়ে নিজেদের ক্রিকেট কাঠামো খুব বেশি শক্তিশালী নয়, তাই আইসিসির কোনও নিষেধাজ্ঞা এলে হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেট বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হবে কিন্তু তার মানে এই নয় বাংলাদেশের পুরো ক্রিকেট ধ্বংস হয়ে যাবে, আমারও বিশ্বাস এমন কিছু হলেও অন্যদের মতো বাংলাদেশও ঘুরে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত আইসিসির জন্য একটি সতর্ক বার্তা অর্থাৎ একচোখা নতজানু নীতি নয়, সব দেশের প্রতি সমান দৃষ্টি থাকতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে সমর্থকদের হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সবসময়ই দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক, আশা করছি অভিভাবক হিসেবে হুট করে কোনও সিদ্ধান্ত না নিয়ে দলের ভালোমন্দ, ভবিষ্যৎ বিবেচনা করেই নিশ্চয় তারা আগামীদিনে সব সিদ্ধান্ত নিবে ।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

পূর্ববর্তী নিবন্ধপবিত্র জুমার দিনের ফজিলত, মাহাত্ম্য ও বিশেষ আমল
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা