রাঙামাটির প্রাথমিক শিক্ষায় সংকট কাটবে কবে?

২০২২ সাল থেকে ৩ দফায় নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | বুধবার , ১২ নভেম্বর, ২০২৫ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য রাঙামাটি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদে ২০২২ সালের ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। নানা জটিলতায় এ পর্যন্ত তিনবার সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদে তিন দফায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও পরীক্ষাই নিতে পারেনি জেলা পরিষদ। এ নিয়ে সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দফায় নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হল। ২০২২ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে ২০২৫ সালে এসে শেষ করা না গেলেও প্রতি বছরই অবসরজনিত কারণে শূন্যপদের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে জেলার প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদান ব্যহত হওয়ার কথা বলছেন শিক্ষাবিদরা।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, রাঙামাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি প্রার্থীদের বয়সসীমা ৪০ বছর নির্ধারণ করে ২০২২ সালে ২৯ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদের প্রবিধান অনুযায়ী নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয় এবং নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়। সে বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার তারিখও নির্ধারিত হয়। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষার আগেই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়োগ কমিটি গঠন নিয়ে মতদ্বৈততা পোষণ করে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি না প্রেরণের কারণে পরিষদ প্রথম দফার এ পরীক্ষা স্থগিত করে। কমিটি গঠন নিয়ে মতদ্বৈততায় নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের বিষয়ে মতৈক্য (জেলা পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী কমিটি গঠন) হওয়ার পর স্থগিত পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এতেও তৈরি হয় নতুন জটিলতা। পার্বত্য মন্ত্রণালয় বলে, ৪০ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের সার্কুলারটি বাতিল হয়েছে। কাজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ৪০ বছর বয়সসীমা কার্যকরকরণ স্থগিত রাখার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়। এরপর ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর পরবর্তীতে বয়সসীমা ৪০ বছর কার্যকর করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত দেয় মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে ঘটে আরেক বিপত্তি। বয়সসীমা চূড়ান্ত করার পর ৩০ বছর উর্ধ্ব আবেদনকারীদের (পরীক্ষার্থী) বাদ দিয়ে ৩০ বছর বয়সসীমার প্রার্থীদের বাছাই করে তাদের আবার নতুন করে ২০২৪ সালের ২৪ মে পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি নেয় রাঙামাটি জেলা পরিষদ।

এবার ৩০ উর্ধ্ব একজন প্রার্থী তাকে কেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না, এ কারণ জানতে উচ্চআদালতে রিট করেন। ওই রিটে উচ্চআদালত ৩০ বছর উর্ধ্ব যারা আগে পরীক্ষার জন্য কার্ড পেয়েছেন তাদেরকেও কার্ড দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে কার্ড ইস্যু করা সম্ভব ছিল না জেলা পরিষদের। এ জটিলতায় ২০২৪ সালের দ্বিতীয় পরীক্ষাও অবশেষে স্থগিত হয়।

সবশেষ চলতি (২০২৫) বছরের ২৭ আগস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ এবং জাতীয়করণকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাকপ্রাথমিক শ্রেণীর জন্য রাজস্ব খাতের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক পদে (১৩তম গ্রেড) বয়সসীমা সর্বনিম্ন ২১ থেকে সর্বোচ্চ ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়। এ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী রাঙামাটি জেলায় প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকের ৫৮৯টি শূন্য নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়। এরমধ্যে ৩০২টি রাজস্ব এবং ২৮৭টি প্রাকপ্রাথমিকের পদ ছিল। আগামী ১৪ নভেম্বর শুক্রবার এ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার ‘অনিবার্যকারণ’ দেখিয়ে পরীক্ষা স্থগিত করে জেলা পরিষদ।

ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীরা, যা বলছে জেলা পরিষদ : মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ নিয়োগ পরীক্ষার স্থগিত হওয়ার খবরে পরীক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদারের দপ্তরে যায়। কিন্তু তাকে না পেয়ে ছুটে যান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে। তাকেও পাননি পরীক্ষার্থীরা। তবে তারা ১৪ নভেম্বর তারিখে যথারীতি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা, নিয়োগ পরীক্ষার স্থগিতাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে পুনরায় পরীক্ষার নোটিশ প্রদান এবং অবৈধ, অনিয়ম পরিহার করে মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানান।

নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের শিক্ষা বিভাগের আহ্বায়ক ও ফোকাল পারসন বৈশালী চাকমা বলেন, আমাদের মোট পরীক্ষার সংখ্যা ৭ হাজার। এখানে আমরা কোডিং সিস্টেম করছি। ৭ হাজার জনের কোডিং সিস্টেম করতে আমাদের প্রায় ৩ দিনের মতো সময় লাগবে। কোডিংয়ের পর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে আমাদের ৬৭দিন লাগবে। এরপর ফলাফল প্রস্তুত করতে হবে। এরপর বাদ পড়া ব্যতীত আরো প্রায় ২ হাজার পরীক্ষার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নিতে সময় লাগবে। এরমধ্যে সরকার ঘোষণা করেছে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। এক্ষেত্রে আমাদের মৌখিক পরীক্ষা নিতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ লাগতে পারে। আমাদের মনে হয়েছে সে সময়ে আমরা কোনো সাপোর্ট পাব না। সে জন্য চেয়ারম্যান মহোদয়সহ আমরা সকল সদস্যবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরীক্ষা স্থগিত করব এবং পরবর্তীতে তফসিল ঘোষণা যদি পিছিয়ে যায় সেক্ষেত্রে আমরাও পরীক্ষা নেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতনে অর্থের সম্মতি
পরবর্তী নিবন্ধবিচারের জন্য প্রস্তুত হাসিনাসহ ২৮৬ জনের মামলা