মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। কয়েকদিন ধরে চলছে এই সংঘর্ষ। সংঘর্ষে থেকে ছোড়া গুলি এসে কক্সবাজারের টেকনাফের সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং তেচ্ছিপুল এলাকায় হুজাইফা আফনান (৯) ওরফে ‘পুতুনি’ নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ শিশু লম্বাবিল এলাকার জসিম উদ্দিনের মেয়ে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিওতে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল রোববার ভোরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার খবরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে নজরদারি ও সতর্কতা জারি করেছে বিজিবি।
এদিকে এই ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে তাড়া খেয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে ৫২ জন বিদ্রোহী যোদ্ধা। বিজিবি তাদের আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। আটকদের মধ্যে ৫০ জন মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য এবং দুজন বাংলাদেশি রয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে আরাকান সালভেশন আর্মির তিনজন, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির ২৯ জন ও রোহিঙ্গা ইসলামী মাহাসের ১৮ জন সদস্য রয়েছে।
গুলিতে শিশু আহতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার প্রতিবাদে তারা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কক্সবাজার–টেকনাফ প্রধান সড়কের লম্বাবিল ও তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে কিছু সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল বলেন, হুজাইফার অবস্থা এতটাই গুরুতর যে, প্রথমে সে মারা গিয়েছিল বলে সবাই ধারণা করেছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে আইসিইউতে জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে সে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের (ইউপি) সদস্য সিরাজুল মোস্তফা জানান, সর্বশেষ গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের বিপরীতে রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার এলাকায় থেমে থেমে ব্যাপক গোলাগুলি, মর্টারশেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম কেঁপে উঠছে। লোকজন রাত জেগে সময় পার করে। অনেকে ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ স্থানে সরে যায়।
বিজিবি রামু সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল মহিউদ্দীন আহমদ বলেন, মিয়ানামরে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে ৫২ জন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য। তাদের মধ্যে কয়েকজন আহত রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করার সাথে সাথে তাদেরকে আটক করে বিজিবি। আটকের আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাতে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
সীমান্তের নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেই সাথে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জান্তা বা যে বাহিনীই হোক সীমান্ত আইন লক্সঘন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, রাত ৮টার দিকে বিজিবির হাতে আটক হওয়া অনুপ্রবেশকারীদের থানায় হস্তান্তর করা হয়। অনুপ্রবেশসহ সংশ্লিষ্ট আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে বিজিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে সতর্ক করা হয়েছে।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও থেমে থেমে গুলিবর্ষণ চলছে। অন্যদিকে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা হামলা চালাচ্ছে।












