ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম–৬ (রাউজান) আসনে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চূড়ান্ত হওয়া প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। তবে প্রাথমিকভাবে দলের সমর্থন পাওয়া দুই প্রার্থীর একজন দাবি করেছেন, তিনি ‘সবুজ সংকেত’ পেয়েছেন। অপরজনের দাবি, তাকে ‘প্রস্তুতি’ নিতে বলেছেন দলের চেয়ারম্যান। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএনপির দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারা।
এমন পরিস্থিতিতে কিছুটা ‘অস্বস্তিতে’ পড়েছেন রাউজান উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, ধানের শীষ প্রতীক যিনি পাবেন তার জন্য কাজ করবেন তারা। কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও ধানের শীষ কে পাচ্ছেন তা নিশ্চিত না হওয়ায় এলাকায় সক্রিয় হতে পারছেন না তারা। কারণ ধানের শীষ প্রত্যাশী একজনের কর্মসূচিতে উপস্থিত হলে অপরজনের কর্মীদের রোষানলে পড়ার শঙ্কা আছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই–বাছাইয়ে দুজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
জানা গেছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ‘রাজনৈতিক দল মনোনীত প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট দলের প্রত্যয়নপত্র মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে’। এ নিয়ম রক্ষার জন্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের দল মনোনীত প্রার্থীদের প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু রাউজানে গিয়াস কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার দুজনকেই প্রত্যয়নপত্র দেয়। এর মধ্যে ২৮ ডিসেম্বর গোলাম আকবরকে ও ২৩ ডিসেম্বর গিয়াস কাদেরকে এ প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়। অবশ্য এর আগে গিয়াস কাদেরকে ৪ ডিসেম্বর দলের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গোলাম আকবর খোন্দকারকে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে ২৭ ডিসেম্বর এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেয়া প্রত্যয়নপত্রে তারিখ ছিল ২০ ডিসেম্বর।
এদিকে গিয়াস কাদের ও গোলাম আকবর খোন্দকার দুজনই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকে নিজেদের বিএনপি প্রার্থী বলে দাবি করে আসছেন। এছাড়া তাদের অনুসারীরাও পৃথক কর্মসূচি পালন করে আসছেন রাউজানে। এছাড়া দুজনই ভোটকেন্দ্র কমিটি গঠন করেছেন।
৯ জানুয়ারি নগরের গুডস হিলের বাসভবনের সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে ‘সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে’ দাবি করে বলেন, ‘একদম হাইয়েস্ট লেভেল থেকে আমাকে বলেছে, আপনি এগিয়ে যান। এটা আনঅফিশিয়ালি আমাকে জানানো হয়েছে। অফিশিয়ালি জানানো হবে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই জানানো হবে। আপনারাও জেনে যাবেন।’
দলের পক্ষ থেকে কোনো বার্তা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে গোলাম আকবর খোন্দকার আজাদীকে বলেন, ‘আমাকে সবুজ বা লাল কোনো সংকেতই দেয়নি। আমাকে এলাকায় গিয়ে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দলের মাননীয় চেয়ারম্যান নির্দেশ দিয়েছেন’। তিনি বলেন, ‘রাউজানবাসীর কাছে আমার আহ্বান থাকবে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে, যারা চাঁদাবাজি করে তাদের যেন চিহ্নিত করা হয়। একইসঙ্গে যাদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি হচ্ছে তাদেরকেও যেন চিহ্নিত করে।’
শেষ পর্যন্ত রাউজানে কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন তা জানার জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সবাই জানিয়েছেন, রাউজানের বিষয়টি সরাসরি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান মনিটরিং করছেন। কৌশলগত কারণে দুজনকে দলের প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের আগে দুজনের একজনকে চূড়ান্ত করা হবে, যা নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি তাদেরও জানিয়ে দেয়া হবে।
রাউজানের বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, দলের উচিত দ্রুত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা। উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়ন বিএনপির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজাদীকে বলেন, আমার কোনো পদ–পদবী নেই। কিন্তু অতীতে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। ভোটের মাঠেও ধানের শীষের জন্য কাজ করব। কিন্তু আপাতত চুপ থাকতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ একজনের আমন্ত্রণে তার কর্মসূচিতে যাওয়ার পর তিনি চূড়ান্ত না হলে বেকায়দায় পড়ব। তখন যিনি চূড়ান্ত হবেন তার কর্মীদের রোষানলে পড়তে হবে।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী রাউজান উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ আজাদীকে বলেন, রাউজানে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী কোনো বিকল্প নেই। ৯৬ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাঠের নেতাকর্মীরা তার সাথে আছেন। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। রাউজানের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারলে তিনি বিজয়ী হবেন।
গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারী রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে বলেন, গোলাম আকবর খোন্দকার একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ। দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি রাজনীতি করেন। রাউজানের মানুষের কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। দলের হাইকমান্ড তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে শত্রু–মিত্র সবাইকে নিয়ে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিতে কাজ করব।
উল্লেখ্য, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর অষ্টম (২০০১) ও নবম (২০০৮) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে বিএনপির প্রার্থী হলেও পরাজিত হন। গোলাম আকবর খোন্দকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাউজান থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।












