রশিতে ঝুলছে যে জীবন

নির্মাণ শ্রমিকের নিরাপত্তা উপেক্ষিত কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে মৃত্যুর ঘটনা

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ২৯ মে, ২০২২ at ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ

কর্মক্ষেত্রে নির্মাণ শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছেই। নিরাপত্তার ব্যাপারে নিজেদের সচেতনতার অভাব তো আছেই, ভবন মালিকদের উদাসীনতাও কাটছে না। নির্মাণ শ্রমিক মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনার পর সমঝোতার বেড়াজালে বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হয় না। ফলে তা প্রকাশও পায় না। আবার নিহত বা আহত শ্রমিকের পরিচয়পত্র না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক বা তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে না।
অনেক সময়ই প্রাণ হাতে নিয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে নির্মাণ শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। কাগজে-কলমে কিছু আইনকানুন আছে বটে বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই বললেই চলে। প্রায় প্রতিদিন নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যু সংবাদ খবরের কাগজের পাতার এক কোণে ঠাঁই পায়। হয়তো নির্মাণাধীন কোনো স্থাপনার ছাদ ধসে পড়ে, হয়তো কোনো রকম সেফটি গার্ড ছাড়াই অনেক উঁচুতে ঝুলন্ত অবস্থায় কাজ করতে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে অথবা অসাবধানতার কারণে নিচে পড়ে যাওয়া, কিংবা নিচ থেকে মালামাল ওপরে তুলতে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে নিচে পড়ে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনার পর নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যুর হারই অধিক বলে পরিসংখ্যানে জানা গেছে।
ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ওসমান গনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। তিনি বলেন, নির্মাণ শ্রমিক হতাহতের ঘটনা গণমাধ্যমে যতটুকু আসে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। নির্মাণ স্থলে সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম না থাকার কারণেই মূলত দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে একথাও ঠিক যে, শ্রমিকদের মধ্যেও সচেতনতা কম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারির কারণে বাড়ছে হতাহতের ঘটনা। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক বা তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রধান অন্তরায় ভিকটিম শ্রমিকের পরিচয়পত্র না থাকা। একজন শ্রমিক গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজে লেগে পড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের চুক্তিপত্র ছাড়াই কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। আবার হতাহতদের অধিকাংশই অল্প শিক্ষিত এবং সংগঠনের তালিকাভুক্ত নন। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায়ে মালিক পক্ষকে চাপ দেওয়া সম্ভব হয় না অনেক সময়। আইনেও পার পেয়ে যান তারা। শ্রমিকদের কল্যাণে মালিক-ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নমনীয় হয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ইনসাবের এক পরিসংখ্যানে জানা যাচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় কাজ করতে গিয়ে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তার মধ্যে ১৫ শতাংশ শ্রমিক মারা যান নির্মাণস্থলে উঁচু থেকে পড়ে, ৭-৮ শতাংশ মারা যান আগুনে পুড়ে ও চোখে আঘাত পেয়ে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনায় হাত-পা কেটে যাওয়া, আঙুল কেটে পড়ে যাওয়া বা এমন নানা ধরনের অঙ্গহানির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করে। কিন্তু এ নীতিমালা কেউ মানে বলে মনে হয় না। আবার শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকারীদের। ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২, জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৬ প্রভৃতি আইন ও বিধানে নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে। এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণের সময় চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে হবে। উঁচু স্থানে কাজ করার সময় লিফট, সেফটি বেল্ট, শক্ত দড়ি-মাচা ব্যবহার; কাজের সময় মাথায় হেলমেট, পায়ে গামবুট ও মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বিদ্যুতের তারের কাছে ভেজা রড ওঠানো-নামানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই নির্দেশনায়। এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লেখিত নির্দেশনা খুব একটা মানা হয় না। বাংলাদেশে নির্মাণ শিল্পে কর্মক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ শ্রমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না। এছাড়া উপযুক্ত নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে। ফলে তারা নানা ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ছেন।
গত ১৭ এপ্রিল বেলা ১২টায় পতেঙ্গার দক্ষিণ ডেলপাড়ার সেকান্দার মিয়ার নির্মাণাধীন ভবনের দোতলায় বাইরের দিকে বাঁশের ঘেরা দেওয়ার সময় পা পিছলে পড়ে জামাল মিয়া (৪৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ১২ এপ্রিল দুপুর ১টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নে মহালংকা এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে মো. মহসিন (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০ মার্চ রোববার বিকেল ৩টার দিকে নগরীর ডবলমুরিংয়ের বার-কোয়ার্টার এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ১২ তলার ছাদ থেকে পড়ে মো. রুবেল নামে (১৮) এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি রোববার সকালে খুলশী থানার ৮ নম্বর গলিতে ভবনে রং করার সময় বহুতল ভবন থেকে পড়ে আনোয়ার হোসেন নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২৫ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে মীরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে নির্মাণাধীন ভবনের আট তলার ছাদ থেকে পড়ে মো. নিরব (৪০) নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জানুয়ারি রোববার হালিশহর থানাধীন ছোটপুল এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের সাত তলা থেকে ক্রেনের তার ছিঁড়ে পড়ে আলো নামে এক নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতবু থেমে নেই লোভী শিকারিদের তৎপরতা
পরবর্তী নিবন্ধমানুষ চাইলে তিন বেলা মাংস খেতে পারে : প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী