রমজান ও সামাজিক ন্যায়বোধ

মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম | রবিবার , ১৫ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি পরম করুণাময়। সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাহাবীগণের উপর।

একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার আকাশছোঁয়া ভবন, দ্রুতগতির অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং সেই সমাজ কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল তার উপর নির্ভর করে। আজকের বিশ্বে উন্নয়নের ভাষা যত জোরালো হচ্ছে, সামাজিক বৈষম্য ও অবিচার তত গভীর হচ্ছে। ধনী আরও ধনী হচ্ছে, দরিদ্র আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। সামাজিক আস্থা দুর্বল হচ্ছে, মানুষেমানুষে দূরত্ব বাড়ছে। এই বাস্তবতায় পবিত্র রমজান মাস হচ্ছে সমাজকে নতুন করে ন্যায়বোধের পথে ফেরানোর এক শক্তিশালী নৈতিক আহ্বান।

রমজানের শিক্ষা ব্যক্তি থেকে শুরু হলেও তার লক্ষ্য কখনোই শুধু ব্যক্তি নয়। ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজকে আলাদা করে দেখে না। একজন ব্যক্তির নৈতিকতা সমাজকে প্রভাবিত করে, আর সমাজের অবস্থা ব্যক্তির চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে। রমজান এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। রোজার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে সংযত করে, আর সেই সংযম থেকেই জন্ম নেয় সামাজিক ন্যায়বোধ।

পবিত্র রমজান সামাজিক সমতার এক বাস্তব অনুশীলন। এই মাসে ধনীগরিব, ক্ষমতাবানক্ষমতাহীন সবাই একই নিয়মে রোজা রাখে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সবার জন্য বিধান এক। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতা কারও জন্য আলাদা নয়। এই বাস্তবতা নীরবে ঘোষণা করে মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ, পদ বা সামাজিক অবস্থানে নয়; বরং তার নৈতিক অবস্থানে। এই উপলব্ধিই সামাজিক ন্যায়বোধের ভিত্তি।

রমজান মানুষকে সহমর্মিতা শেখায়। একজন রোজাদার যখন ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে, তখন সে সমাজের দরিদ্র মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যে কষ্ট আগে ছিল দূরের কোনো গল্প, রমজানে তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা হৃদয়কে নরম করে, মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। সহমর্মিতা ছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়, আর রমজান সেই সহমর্মিতার চর্চা করায়।

জাকাত, ফিতরা ও সদকা দেওয়ার আগ্রহ রমজানের সামাজিক ন্যায়বোধের সবচেয়ে কার্যকর প্রকাশ। এগুলো কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; বরং সমাজের বঞ্চিত মানুষের অধিকার। ইসলামী দর্শনে সম্পদ কেবল ব্যক্তির ভোগের উপকরণ নয়; এতে দরিদ্রের অংশ নির্ধারিত আছে। এই নীতিই সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রোধ করে এবং সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, সেখানে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

রমজান আমাদের শেখায় ন্যায়বিচার শুধু আদালতের বিষয় নয়; এটি দৈনন্দিন আচরণের বিষয়। বাজারে সঠিক ওজন দেওয়া, পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, কর্মচারীর মজুরি সময়মতো পরিশোধ, দুর্বলকে সুযোগ করে দেওয়া এসবই সামাজিক ন্যায়বোধের বাস্তব রূপ। সমাজে দুর্নীতি ও অবিচারের মূল কারণ অনেক সময় আইনের অভাব নয়, বরং নৈতিক সংযমের অভাব। রমজান সেই নৈতিক ভিতকে শক্ত করে।

আজকের সমাজে এক বড় সংকট হলো উদাসীনতা। অন্যায় দেখে মানুষ চুপ থাকে, বঞ্চনা দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই নির্লিপ্ত মনোভাব সমাজকে ধীরে ধীরে অসাড় করে তোলে। রমজান এই উদাসীনতার বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ। রোজা মানুষকে শুধু নিজের কথা ভাবতে শেখায় না; বরং অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। এই অনুভূতিই মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহসী করে তোলে।

রমজান সামাজিক ঐক্যেরও এক শক্তিশালী মাধ্যম। একসাথে ইফতার, একসাথে নামাজ, একসাথে দোয়া এই সমষ্টিগত ইবাদত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। ধর্ম, শ্রেণি বা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য এই সময়ে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। সমাজ তখন বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর সমষ্টি না থেকে একটি মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ কাঠামোতে রূপ নেয়।

তবে বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় রমজানের সামাজিক শিক্ষাকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। ব্যক্তি হিসেবে ইবাদত বাড়ে, কিন্তু সামাজিক আচরণে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। রোজা রেখে বাজারে কারসাজি, কর্মক্ষেত্রে অন্যায় বা দুর্বলকে অবহেলা এসব রমজানের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। রমজান আমাদের শেখায় ইবাদত ও ন্যায়বোধ আলাদা বিষয় নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।

সামাজিক ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও রমজানের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণে যদি ন্যায়, স্বচ্ছতা ও দুর্বল শ্রেণির সুরক্ষা নিশ্চিত না হয়, তবে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে না। রমজান রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষমতা মানে ভোগ নয়, দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই সমাজে আস্থা ফিরে আসে।

রমজান আমাদের শেখায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা কোনো হঠাৎ ঘটনা নয়; এটি ধারাবাহিক চর্চার ফল। পরিবারে ন্যায়, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়, সমাজে ন্যায় এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেই একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে ওঠে। রমজান এই ধারাবাহিকতার সূচনা ঘটায়।

সামাজিক ন্যায়বোধ ছাড়া রমজানের শিক্ষা অসম্পূর্ণ। ব্যক্তি যদি সংযমী হয়, কিন্তু সমাজ যদি বৈষম্য ও অবিচারে ভরা থাকে, তবে রমজানের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। এই মাস আমাদের শেখায় নিজেকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সমাজকে ন্যায়ের পথে আহ্বান করাও ঈমানের অংশ।

এই রমজানে আমাদের অঙ্গীকার হোক আমরা শুধু নিজের ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকব না; বরং অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেতন হব। তাহলেই রমজান ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই কল্যাণের মাসে পরিণত হবে।

এ বিষয়ে আমাদের জন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের সুস্পষ্ট ঘোষণা হচ্ছে -‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।’সূরা আননাহল : ৯০

হাদিসে পাকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখো এটাই তার প্রতি সাহায্য।’সহিহ বুখারি।

লেখক: প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ