রমজান ও আত্মসংযম

মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম | সোমবার , ২ মার্চ, ২০২৬ at ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি পরম করুণাময়। সালাম ও বরকত বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা:), তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সাহাবীগণের উপর।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ও কঠিন সংগ্রাম বাইরের কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়; বরং নিজের ভেতরের প্রবৃত্তির সঙ্গে। লোভ, ক্রোধ, অহংকার, অসংযম ও অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা এই অদৃশ্য শক্তিগুলোই মানুষকে ধীরে ধীরে নৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে। সভ্যতা যত আধুনিক হয়েছে, এই প্রবৃত্তিগুলো তত বেশি পরিশীলিত শক্তি রূপে মানুষের সামনে হাজির হয়েছে। আজকের সমাজে আত্মসংযম যেন অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ঠিক এই বাস্তবতায় পবিত্র রমজান মাস মানুষের জীবনে বার্তা নিয়ে আসে আত্মসংযমের এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে।

রমজানের মৌলিক চাহিদা হল রোজা মানে কেবল না খেয়ে থাকা নয়; বরং বৈধ চাহিদা থেকেও নির্দিষ্ট সময় নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এই মাসে শেখাতে চান যে ব্যক্তি বৈধ বিষয় থেকেও নিজেকে সংযত রাখতে পারে, সে অবৈধ ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হয়। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই তাকওয়ার ভিত্তি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপ।

আধুনিক জীবনে মানুষ তাৎক্ষণিক তৃপ্তির অভ্যাসে অভ্যস্ত। ক্ষুধা লাগলেই খাবার, ক্লান্তি এলেই বিনোদন, ইচ্ছা জাগলেই ভোগ এই সংস্কৃতি মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতা নষ্ট করছে। রমজান এই প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মানুষকে শেখায় অপেক্ষা করতে। সুবহে সাদিক থেকে ইফতার পর্যন্ত অপেক্ষা করা কেবল সময় গণনা নয়; এটি প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনার এক গভীর মানসিক অনুশীলন। এই অপেক্ষাই মানুষকে শেখায় সব প্রাপ্তি তাৎক্ষণিক নয়, কিছু অর্জনের জন্য ধৈর্য ও সংযম অপরিহার্য।

রমজানে সংযম কেবল খাদ্য ও পানাহারে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইসলামী শিক্ষায় রোজা হলো চোখের, কানের, জিহ্বার ও অন্তরের রোজা। অশালীন দৃশ্য থেকে দৃষ্টি সংযত রাখা, পরনিন্দা ও অসত্য কথা না শোনা, মিথ্যা ও কটু বাক্য পরিহার করা এসবই রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ পেটের রোজা রাখে, কিন্তু আচরণের রোজা রাখে না। এতে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং আত্মসংযমের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। অথচ আত্মসংযম মানুষের চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সংকটের মুহূর্তে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয় না। পরিবারে সে ধৈর্যশীল হয়, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ববান হয়, সমাজে সে সহনশীল ও ন্যায়পরায়ণ আচরণ করে। আজকের সমাজে পারিবারিক ভাঙন, সামাজিক সহিংসতা ও পেশাগত অনৈতিকতার পেছনে আত্মসংযমের অভাব একটি বড় কারণ। একমাত্র পবিত্র রমজান মাসেই এই অভাব পূরণের সুযোগ এনে দেয়।

বিশেষ করে তরুণ সমাজের জন্য রমজানের আত্মসংযমের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণদের মনোযোগ দ্রুত বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, ধৈর্য কমছে। দ্রুত সাফল্য ও তাৎক্ষণিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে। রমজান তরুণদের শেখায় জীবনের প্রতিটি অর্জন তাৎক্ষণিক হয় না; প্রকৃত সাফল্যের জন্য সময়, পরিশ্রম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই শিক্ষা তরুণদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মসংযম মানে নিজের আনন্দকে দমন করা নয়; বরং আনন্দকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। রমজান এ কথাই শেখায়, দীর্ঘ সংযমের পর ইফতারের স্বাভাবিক আহার মানুষকে উপলব্ধি করায় সংযম আনন্দহীন নয়, বরং সংযমই আনন্দকে অর্থবহ করে তোলে। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল জীবনের চাবিকাঠি। রমজানের রাতগুলো আত্মসংযমের আরেকটি উচ্চতর স্তর উন্মোচন করে। দিনের ক্লান্তির পর বিশ্রামের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারাবির নামাজে দাঁড়ানো, কুরআন তিলাওয়াতে সময় দেওয়া এসবই অলসতার বিরুদ্ধে আত্মসংযমের বাস্তব চর্চা। নিরিবিলি রাতে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে সংশোধনের অঙ্গীকার করা আত্মসংযমের পরিণত রূপ।

আত্মসংযমের চূড়ান্ত ফল হলো তাকওয়া আল্লাহভীতির সচেতন অনুভূতি। তাকওয়া মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থায় সৎ থাকতে শেখায়। আইন বা সামাজিক চাপে নয়, বরং অন্তরের জবাবদিহির বোধ থেকেই সে অন্যায় থেকে বিরত থাকে। এই তাকওয়াই ব্যক্তি ও সমাজকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে।

যদি রমজানের আত্মসংযম কেবল এই এক মাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার প্রভাব ক্ষণস্থায়ী হয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন রমজানের সংযম বছরের বাকি সময়েও আচরণে প্রতিফলিত হয় কথাবার্তায় সংযম, সিদ্ধান্তে ধৈর্য, ভোগে সীমাবদ্ধতা ও আচরণে নৈতিকতা হিসেবে। রমজান আসলে মানুষকে সারা বছরের জন্য একটি নৈতিক মানদণ্ড দিয়ে যায়।

রমজান আমাদের শেখায় নিজেকে জয় করাই সবচেয়ে বড় বিজয়। বাহ্যিক শক্তি অর্জনের চেয়ে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন, কিন্তু এর ফল অনেক গভীর ও স্থায়ী। এই কঠিন কাজটিকে সহজ করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা রমজানের মতো একটি মহামূল্যবান মাস দিয়েছেন।

তাই স্পষ্টভাবে বলা যায় আত্মসংযম ছাড়া রোজা কেবল একটি শারীরিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর আত্মসংযম অর্জিত হলে রোজা হয়ে ওঠে মানুষের চরিত্র পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। পবিত্র রমজানে আমাদের অঙ্গীকার হোক আমরা শুধু ক্ষুধা দমন করব না, বরং প্রবৃত্তিকেও নিয়ন্ত্রণে আনব; শুধু রোজা রাখব না, বরং নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলব। আজকের পর্বের পুরো বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবনের প্রয়োজনে পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাকের ঘোষণা এবং হাদীসে পাকে রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী দিয়ে আজকের এই পর্ব সমাপ্ত করছিপবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করেছে এবং প্রবৃত্তিকে বিরত রেখেছে তার আবাসস্থল হবে জান্নাত।’ সূরা আননাযিয়াত : ৪০৪১পক্ষান্তরে হাদিসে পাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। সুতরাং তোমাদের কেউ রোজা থাকলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া না করে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমাগফিরাতের দশ দিনের আমল ও ফজিলত
পরবর্তী নিবন্ধরবীন্দ্রকাব্যে বসন্ত : প্রকৃতির নবজাগরণ