রমজান: আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জনের মাস

ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিম শাহ্‌ | বৃহস্পতিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:৩৬ পূর্বাহ্ণ

আত্মা মহাআত্মার খণ্ডিত অংশ। আত্মার সাথে মহাত্মার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রতিটি মানব পবিত্র আত্মা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে পার্থিব চাহিদা মিটাতে গিয়ে প্রবৃত্তির তাড়নায় অনৈতিককর্মে লিপ্ত হয়ে আত্মাকে কলুষিত করে। আত্মা অপবিত্র হলে সমস্ত দেহই অপবিত্র হয়। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছেরসূল (.) বলেন, ‘মানবদেহে এমন একটি মাংসের টুকরো রয়েছে এটি যখন যথাযথ পবিত্র হয় তখন সমস্ত দেহই পবিত্র হয়, এটি যখন অপবিত্র হয় তখন সমস্ত দেহই অপবিত্র হয়ে যায়। মাংসের টুকরোটির নাম হৃদয় (কলব)। অর্থাৎঅন্তর বা আত্মা। স্বাভাবিকভাবে মানবাত্মা পবিত্রতা অর্জন করলে (মহাত্মা) আল্লাহর সাথে কানেকটেড থাকে। অপরদিকে আত্মা অপবিত্র হলে মহাত্মা (আল্লাহ) থেকে ডিসকানেক্টেড হয়। ‘কলব’ হল আল্লাহর অবস্থানক্ষেত্র। হাদিসে কুদসিতে আছেআল্লাহ বলেন, ‘আমার বেহেস্ত আমাকে ধারণ করে না, পৃথিবীও না, কিন্তু আমার বিশ্বাসী বান্দার অন্তর আমাকে ধারণ করে’। আত্মা পাপিষ্ঠ হলে সেখানে আল্লাহ অবস্থান করেন না।

হযরত জালাল উদ্দিন রুমি (.)বলেছেন, ‘মানুষ অর্ধেক ফেরেশতাসম, অর্ধেক পশু সম।’ অর্থাৎ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটোই রয়েছে। ইতিবাচকতা স্রষ্টামুখী, নেতিবাচকতা শয়তানমুখী করে।

প্রবৃত্তির গোলামিতে লিপ্ত থাকার ফলে আত্মা অপবিত্র হয়। অপবিত্র আত্মা নিয়ে যতই ইবাদত করি না কেন আল্লাহর নৈকট্যতা লাভ করা দুরূহ। এভাবে সারা বছর পাপাচারে লিপ্ত থাকলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন অতীব দয়ালু ও ক্ষমাশীল বিধায় তিনি চান না বান্দাগণ তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে রসাতলে যাক।

বান্দা যাতে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হতে পারে সেজন্য তিনি এমন একটি মাস দিয়েছেন যে মাস রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস। এর নাম রমজান ; যা অতি মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ বরকতময় মাস। (অন্যান্য মাসেও যে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা কিংবা দয়া করেন না, তা নয়; আল্লাহ চাইলে যখন যেকোনো মুহূর্তে, যে কাউকে যখন ইচ্ছা দয়া ও ক্ষমা করতে পারেন এবং করেন; এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর এখতিয়ার।

কিন্তু রমজান মাস এমন একটি মাস, যে মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বান্দাকে ক্ষমা ও দয়া করার জন্য বিশেষভাবে সুযোগ করে দিয়েছেন। বলা যায় এমাস আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য মুক্তির বিশেষ উপায়, যাতে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধিসহ কলুষিত আত্মাকে পবিত্র করে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। এজন্য রমজান হল আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে স্রষ্টাপ্রাপ্তির পূর্ণ প্রশিক্ষণের মাস।

কিন্তু কীভাবে? রোজায় এমন কী ফজিলত রয়েছে, যা দ্বারা মানব পবিত্রতা অর্জন করে? এর পূর্বে রোজা কী আমাদের জানা উচিত।প্রতিজ্ঞা সহকারে সুবেহসাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একমাস জৈবিক কামাচার, নেতিবাচক কর্ম ও যাবতীয় পানাহার থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার নাম রোজা। রোজা পালিত হয় রমজান মাসে। রোজা পালনে দুটো বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমটি হলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানহার মুক্ত থাকা (উপবাস)। উপবাসের ফলে মস্তিষ্কের নিউরনসমূহ অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়। এতে কর্মের গতি বৃদ্ধি পায়, চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয়, অলসতা ও নিদ্রাকে দূর করে। এর সুপ্রভাবে আত্মা প্রভাবিত হয়। ফলে হৃদয়ে কোমলতা, নমনীয়তা ও উদারতা আসে। পাপিষ্ঠ আত্মা ধীরে ধীরে পবিত্র হয়, সর্বোপরি আত্মা ঊর্ধ্বমুখী হয়। সুফিসম্রাট হযরত ইবনুল আরাবী (.) বলেন, ‘উপবাসের একটি আধ্যাত্মিক স্টেশন আছে। এর বিশেষত্ব হল নম্রতা, সমর্পণ, দাসত্ব, আত্মগৌরবের বিলোপ সাধন, প্রশান্ত আবেগ ও সকল প্রকার নিম্নচিন্তার দূরীকরণ’। রোজা জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে। আধ্যাত্মিক জ্ঞানপ্রাপ্তিতে সহায়তা করে। রমজানে এক থেকে বিশ রোজা পর্যন্ত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়) যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপর থেকে সাওয়াল এর চাঁদ দেখা পর্যন্ত (সম্ভব হলে) এতেকাফের মাধ্যমে যৌনাচার থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থাৎ রমজান মাস সিয়াম সাধনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রকরণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রশ্ন হল রোজার মধ্যে নির্দিষ্ট সময় যৌনাচার থেকে কেন বিরত থাকতে বলছেন? সহজ কথায় বলতে গেলে প্রথমদিকে কিছুটা হলেও নির্দিষ্ট সময়পর্যন্ত বীর্য সংরক্ষণ এবং পরবর্তী ১০ দিন এতেকাফের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রূপে বীর্য সংরক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এমাসে এমন একটি রাত রয়েছে যে রাত হাজার বছরের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এর নাম ‘শবই কদর’। এটি ভাগ্য রজনীর রাত। এ রাতের ফজিলতবরকত অল্প কথায় বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না, যাকে ভাগ্য রজনী বলে। যে ব্যক্তি শবকদরের রাত পেয়েছে সে আল্লাহকে পেয়েছে; এতে কোনো সন্দেহ নেই। রসূল (.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশ দিন তোমরা কদর রাত তালাশ কর (বুখারী ও মুসলিম)। আর ইতিকাফের মাধ্যমে শবকদর পাওয়া সহজ। শেষ দশ দিন রসূলেপাক (.) ইতিকাফ (নীরবে অবস্থান) করতেন, স্ত্রীদের থেকে আলাদা হয়ে যেতেন, রাতে মোটেও নিদ্রা যেতেন না। সার্বিকভাবে এ মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে পাপাচার থেকে বিরত থেকে আত্মশুদ্ধিকরণসহ স্রষ্টার গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রচেষ্টার মাস। অর্থাৎ পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর যে গুণবাচক নাম রয়েছে সেই গুণাবলীসমূহ নিজের মধ্যে ধারণ করার অনুশীলনের মাস। রমজানরহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফেরাত ও শেষ ১০ দিন নাজাতের জন্য ফরিয়াদ করার মাস। সর্বোপরি রমজান মাস পানাহার, পাপাচার ও যৌনাচার থেকে বিরত থেকে আত্মা পরিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে রহমত প্রাপ্ত হয়ে মুক্তির নিশ্চয়তাসহ আল্লাহর নৈকট্যতা অর্জনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার নাম। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় রমজান মাসের মত বরকতময়, পবিত্র মাস পাওয়া সত্ত্বেও সিয়াম সাধনা করে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল না আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে ব্যর্থ হল,তার মত অভাগা কেউ নেই। একদা রসূল (.)কে হযরত জিব্রাইল (.) এসে বললেন, ‘যে রমজান মাস পেল অথচ নিজের গুনাহ মাফ করতে পারল না ; সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক (তিরমিজি শরীফ)। তখন রসূলে পাক(.) বললেন, আমিন।’ আর যারা ধারাবাহিকভাবে এক মাস সিয়াম সাধনা করে আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছেন তাঁদের জন্য কয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ।

আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতের পুরস্কার স্বয়ং আমি দিব, আর রোজার পুরস্কার আমি নিজেই।’ অর্থাৎ স্বয়ং আমাকেই পাবে। রোজার ফজিলত এতই বেশি যে বান্দা যাতে রমজান মাসে রহমত, ক্ষমা ও মুক্তি নিশ্চিত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, সেজন্য প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর উপর রোজা ফরজ করেছেন।

রোজা আল্লাহর নিকট এতই প্রিয় যে, সুফিআউলিয়াগণ শুধু রমজান মাসে নয়, বরং সারা বছরই রোজা রাখেন। প্রখ্যাত সুফি হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ শাহ্‌ (.) মাইজভাণ্ডারী (প্রকাশ হযরত কেবলা), হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান শাহ্‌(.) মাইজভাণ্ডারী (প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী কেবলা), হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক (.) মাইজভাণ্ডারী (প্রকাশ শাহেনশাহ্‌), হযরত মওলানা মতিয়র রহমান শাহ্‌ (.) ফরহাদাবাদী (প্রকাশ শাহ্‌সাহেব কেবলা)’র জীবনী পর্যালোচনা করলে জানা যায় তাঁরা বছরের অধিকাংশ সময়েই রোজা পালন করতেন, উপবাস করতেন, পেটে ক্ষুধা রাখতেন। হযরত কেবলা কাবা বলেছেন, ‘আমার ছেলেরা (পদাঙ্ক অনুসরণকারী) সবসময় রোজা রাখে।’ অতএব এতেই বোঝা যায়, তিনি স্বয়ং রোজা রাখতেন এবং তাঁর আদর্শ ধারণকারীদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। শুধু উপবাস থাকলে হবে না (উপবাসের মধ্যেও কল্যাণ আছে), পাশাপাশি রোজার অন্তর্নিহিত যে কারণ, সেটা অনুধাবন করে ধারাবাহিক আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টায় থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলেই রোজার সার্থকতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করি।

রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে সহজেই আল্লাহর সাথে সব সময় কানেক্টেড থাকা সম্ভব। কারণ রমজান মাসে আত্মশুদ্ধির অনুশীলন, বান্দাকে সারা বছরই আত্মশুদ্ধির অনুশীলনে রাখতে সহায়তা করে। এই মাসে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করলো সেই সফল।

লেখক : সাজ্জাদানশীন, মতি ভাণ্ডার দরবার শরিফ,

ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধড. মইনুল ইসলামের কলাম
পরবর্তী নিবন্ধবদলে যাচ্ছে ভারতের কেরালার নাম, নতুন নাম ‘কেরালাম’