রমজানে বাজার মনিটরিং করবে চসিক প্রয়োজনে বিশেষ অভিযান

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মেয়র হকাররা হুমকি-ধমকি দিলে বৈধ ব্যবসায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও পরামর্শ

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ৭ মার্চ, ২০২৪ at ৭:৪১ পূর্বাহ্ণ

এবার রমজানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং করবে বলে জানিয়েছেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, কেউ সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারিবেসরকারি সংস্থার সাথে কাজ করব আমরা। প্রয়োজনে রোজা উপলক্ষে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অসাধুদের সাবধান করছি, নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে কষ্ট দিলে আইনি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হন। এসময় মেয়র সমগ্র চট্টগ্রামে ফুটপাত মানুষের হাঁটার উপযোগী করে তোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন, সড়কফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় এবার রমজানে যানজটও কমে যাবে। তিনি হকাররা হুমকিধমকি দিলে ‘বৈধ’ ব্যবসায়ীদের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও পরামর্শ দেন। গতকাল সকালে টাইগারপাসস্থ নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে আসন্ন রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলে তিনি। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। তারা দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার বিষয়ে মেয়রকে আশ্বস্ত করেন। সভায় সড়ক ও ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে চসিকের অভিযানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

মেয়র বলেন, রমজানে প্রতিবছর দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। আজ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে আমরা আশ্বস্ত হতে পারি, এ বছর দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখার জন্য ব্যবসায়ীরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবেন। তিনি বলেন, রমজান মাসে আমাদের দুটি সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং যানজট। কেবল আইন বা শাস্তির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যবসায়ী ভাইদেরসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারিবেসরকারি সেবা সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন। রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ রোজাদাররা যাতে কষ্ট না পান সে জন্য আপনাদের (ব্যবসায়ী) সহযোগিতা প্রয়োজন।

মেয়র বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা ফুটপাত করছি, সেটা আরেকজন দখল করবে তা হতে পারে না। বিপুল অংকের টাকা খরচ করে নির্মাণ করা ফুটপাত দিয়ে হেঁটে আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না, মহিলারা নিরাপদে হাঁটতে পারবে না তা মেনে নেয়া যায় না। সমগ্র চট্টগ্রামে ফুটপাত মানুষের হাঁটার উপযোগী করে তুলব।

মেয়র বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় হকার বসত। সাধারণ মানুষের বক্তব্য হচ্ছে এদের জন্য তারা হাঁটতে পারে না। কেউ যদি ওসব হকার থেকে কোনো পণ্য দেখে তাদের কিনতেই হয়, অন্যথায় বেইজ্জতি করে। এভাবে তো একটা শহরে চলতে দেয়া যায় না।

তিনি বলেন, গতকালও আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। সেখানে চলফেরার জায়গা রাখেনি, যত্রতত্র, যেখানে ইচ্ছে সেখানে ফুটপাত দখল করেছে। যেন শহরের যেন মাবাপ নেই। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ যানজট কমাতে সাহায্য করবে জানিয়ে মেয়র বলেন, রমজান মাসে যানজট বেড়ে যায়। তবে এবার নিউ মার্কেট ও আগ্রাবাদ মোড়ে আমরা যে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি তার কারণে যানজট কম হবে বলে মনে করি।

ফুটপাত রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সমর্থনের বিষয়ে মেয়র বলেন, আপনারা এখন সোচ্চার হয়েছেন, ভবিষ্যতেও সোচ্চার হতে হবে। এক্ষেত্রে আমার সহযোগিতা থাকবে। আপনারা (ব্যবসায়ী) নিউমার্কেট, রেয়াজুদ্দিন বাজার, টেরি বাজারসহ অন্যান্য মার্কেটে অনেক টাকা সেলামী দিয়ে দোকান নিয়েছেন। আপনারাই বলেছেন, তাদের (হকার) কিছু বললে হুমকিধমকি দিতে তেড়ে আসে। রাস্তায় বসে অবৈধ কাজকারবার করে আবার আপনাদের হুমকি দেবে! আপনারা বৈধ ব্যবসায়ী। ভ্যাট, ট্যাঙ, ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা করছেন। এরপরও আপনাদের কিসের ভয়? তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেন। এটার জন্য যা যা করতে হয় আমি করব। আপনারা ভয় পাবেন না।

ইতঃপূর্বে উচ্ছেদ করা হয়েছে এমন জায়গায় সন্ধ্যার পর হকারদের ফুটপাত দখল করা নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, বিষয়টি আমি দেখব। এরপরও আপনারা একসাথে গিয়ে পুলিশ কমিশনারকে বলেন। আমি পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি, যেখানে ফুটপাত উচ্ছেদ করব সেখানে যেন স্থানীয় থানাকে মনিটরিং এর দায়িত্ব দেয়া হয়। স্থানীয় থানা যদি মনিটরিং করে ফুটপাত আর দখল হবে না।

মেয়র বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। আমি সবসময় বলি, কোনো প্রভাবপ্রতিপত্তি, কোনো চাপ আমাকে নত করতে পারবে না। আমি কথা কম বলি। কিন্তু কারো ধমকানি ও চোখ রাঙনিতে আমাকে নত করা যাবে না। সাধারণ মানুষের কল্যাণে যেটা করতে হয় সেটা করব। পাঁচ বছরের জন্য তো আমাকে ভোট দিয়েছেন। এই পাঁচ বছর মানুষের কল্যাণে যেটা করতে হয় সেটা করব। পরবর্তী চিন্তা সাধারণ মানুষ করবেন।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, রমজান মাসে আমাদের তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন। আমরা অন্যান্য সরকারি সংস্থাকে সাথে নিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখতে কাজ করব। চসিকের বাজার মূল্য পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ব্যবসায়ীরাও মনিটরিং টিম গঠন করতে পারে। তারা মনিটরিং করলে সবাই প্রশংসা করবেন।

কাউন্সিলর আবদুস সালাম বলেন, রমজান পবিত্র মাস। শুধু ব্যবসার কথা চিন্তা না করি। মানুষকে যেন ধোঁকা না দিই। যে পণ্য বিক্রি করব সেটা যেন ভাল পণ্য হয় সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

সভায় ব্যবসায়ীরা বলেন, মেয়রের উদ্যোগে নগরীর অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা অবৈধ হকারমুক্ত হওয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। তবে, দখলের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হুমকি ও চাপ দিচ্ছে। চট্টগ্রাম অবৈধ হকারমুক্ত হলে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। কারণ, প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সরকারকে ট্যাঙভ্যাট দিয়ে ব্যবসা করে। পক্ষান্তরে, অবৈধভাবে রাস্তাফুটপাত দখল করে যারা ব্যবসা করে তারা অপরাধীদের চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করে, যা শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি। চসিক যেহেতু ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে সেহেতু লাইসেন্সধারী প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রাম সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের আহ্বায়ক ও রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সালামত আলী বলেন, বাজারে মোবাইল কোর্ট করার আগে বাজারের ব্যবসায়ী সমিতিকে অবহিত করলে অভিযান সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়। তিনি রমজানের পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাস্তায় ত্রিপল দিয়ে যে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করা হয় তা নিয়ন্ত্রণের অনুরোধ করেন।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রামের সভাপতি সালেহ আহমদ বলেন, ফুটপাত উচ্ছেদে মেয়রকে সহযোগিতা করা হবে। স্বাস্থ্য সম্মতভাবে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করা হবে। মোবাইল কোর্টে অর্থদণ্ড সহনীয় করার অনুরোধ করে বলেন, আমরা মোবাইল কোর্টের বিরোধী না। কেয়ারি ইলিশিয়ামের ব্যবসায়ী মঈন উদ্দিন চকবাজারকে হকারমুক্ত করার চসিককে উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করেন।

নিউমার্কেটের ব্যবসী নেতারা বলেন, ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে প্রদক্ষেপ যুগান্তকারী। রমজান উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু হকারদের কারণে ক্রেতারা প্রবেশ করতে পারে না। হকাররা এখন দিনের বেলা বসে না। সন্ধ্যার পর বসে। তামাকুমন্ডি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বলেন, ক্রেতারা যেন কমমূল্যে ভাল পণ্য কিনতে পান তা মনিটরিং করব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কড়া নির্দেশ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর
পরবর্তী নিবন্ধপিএইচপির আরো ৫ কোটি টাকা অনুদান