রমজান মাসে রোজা রাখা মুসলিম নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা মা ও ভ্রুণের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম গর্ভবতী নারীদের জন্য রোজা রাখার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে, যদি তা মা বা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হয়। এই প্রবন্ধে রমজানে গর্ভবতী নারীদের করণীয়, পুষ্টি, ঝুঁকি নিরূপণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শের গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে।
ভূমিকা: গর্ভাবস্থায় শরীরে বিপুল শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানিশূন্যতা এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া মা ও ভ্রণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রমজানে গর্ভবতী নারীদের রোজা রাখা উচিত কি না –এ বিষয়ে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য–অবস্থা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ: ইসলামে গর্ভবতী নারীদের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয় যদি –
* মায়ের শারীরিক দুর্বলতা থাকে * ভ্রুণের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে
এক্ষেত্রে পরবর্তীতে কাজা বা ফিদয়া আদায় করার বিধান রয়েছে।
কোন অবস্থায় রোজা না রাখাই উত্তম, নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় –
* তীব্র বমি ও ডিহাইড্রেশন * অ্যানিমিয়া (ঐন কম) * গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (ইনসুলিন নির্ভর) * উচ্চ রক্তচাপ / প্রি–এক্ল্যাম্পসিয়া * ইন্ট্রাউটেরাইন গ্রোথ রেস্ট্রিকশন (ওটএজ) * পূর্বে প্রি–টার্ম ডেলিভারির ইতিহাস * যমজ বা একাধিক গর্ভ
নিরাপদে রোজা রাখতে যা করবেন
১. চিকিৎসকের পরামর্শ : রোজা শুরুর আগে অবশ্যই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে হবে।
২. পর্যাপ্ত পানি পান : ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত কমপক্ষে ২.৫–৩ লিটার পানি।
৩. সুষম খাদ্য গ্রহণ : সেহরিতে–
* জটিল শর্করা (লাল চালের ভাত/ ওটস / আটার রুটি) * প্রোটিন (ডিম, দুধ, ডাল, মাছ) * ফল ও শাকসবজি *খেজুর
ইফতারে: * খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু * স্যুপ * প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার *আয়রন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য
৪. সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ: * আয়রন * ক্যালসিয়াম * ফোলিক অ্যাসিড
(ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সময় পরিবর্তন করা যেতে পারে)
৫. পর্যাপ্ত বিশ্রাম
অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা।
৬. ফিটাল মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ
বাচ্চার নড়াচড়া কমে গেলে রোজা ভেঙে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বিপদের লক্ষণ (রোজা ভেঙে ফেলবেন)
* মাথা ঘোরা / অজ্ঞান ভাব, *প্রস্রাব কমে যাওয়া, * তীব্র পেট ব্যথা * বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া * ভ্যাজাইনাল ব্লিডিং * অতিরিক্ত দুর্বলতা
সম্ভাব্য প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে–
*সুস্থ, কম ঝুঁকির গর্ভাবস্থায় রোজা সাধারণত বড় কোনো জটিলতা তৈরি করে না *তবে ডিহাইড্রেশন ও কিটোসিস হলে ভ্রণের গ্রোথ প্রভাবিত হতে পারে
*তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন
কমিউনিটি ও পাবলিক হেলথ দৃষ্টিকোণ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে –
*অনেক নারী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোজা রাখেন *পুষ্টিহীনতা ও অ্যানিমিয়া বেশি থাকায় ঝুঁকি বাড়ে * সচেতনতা কর্মসূচি প্রয়োজন
উপসংহার : রমজানে গর্ভবতী নারীদের রোজা রাখা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। মা ও ভ্রুণের নিরাপত্তাই প্রধান বিবেচ্য। সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম এবং নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুস্থভাবে রমজান পালন করা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ, প্রসূতি, স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ










