রাজধানীর মতিঝিলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) আয়োজনে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, দেশের ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত। ফলে রোজার সময় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা কম। তবে জ্বালানিসংকট, চাঁদাবাজি, বন্দরে ধর্মঘট ও বাজারে প্রশাসনিক তদারকির অভাবে পণ্যের দামে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে বড় আমদানিকারক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। গত সোমবার রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুত, সরবরাহ এবং মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান। সভায় নিত্যপণ্যের আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান বলেন, চলতি বছর চিনি ও ভোজ্যতেলের আমদানি ও ঋণপত্র খোলার পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেশি। তাই নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে না। তবে এবার নির্বাচনের পরপরই রোজা শুরু হচ্ছে। তাই বাজারের মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব বেশি। চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ আবুল হাশেম বলেন, আমদানি তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঠিক হবে না। চিনি আমদানি বেশি হলেও পণ্য যদি জাহাজেই থাকে, খালাস করা না হয়, তাহলে বাজারে স্বস্তি আসবে না। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, মাত্র চার পাঁচটি কোম্পানি আটা, ছোলা, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্য উৎপাদন, আমদানি এবং বিপণন নিয়ন্ত্রণ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাজারে বিক্রি করেন। অথচ মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকার এসব বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা না করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিকে জরিমানা করেন। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘এবার মিলগেট পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৯২ থেকে ৯৩ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম। এবার আমরা যে পরিমাণ চিনি সরবরাহ করছি, তা মেঘনা গ্রুপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে সামনে নির্বাচনের কারণে সরকারি ছুটি ও বন্দরের আন্দোলনের প্রভাবে পণ্য সরবরাহে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
এদিকে, শ্যামবাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন বলেন, করপোরেট ব্যবসায়ী আর সিন্ডিকেটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তারা একই শক্তি। শ্যামবাজার থেকে প্রতিদিন পুলিশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এক লাখ টাকা করে চাঁদা নেয়। এই বাড়তি অথের্র বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর পড়ে। কাঁচাবাজারে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই মন্তব্য করে বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইমরান মাস্টার বলেন, কাঁচামাল পচনশীল দ্রব্য। তাই এখানে সিন্ডিকেট সম্ভব নয়। সময়মতো বিক্রি না হলে এসব পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। রোজায় পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা ও বেগুনের মতো পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। তাই রোজায় কাঁচাবাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না। তবে এখন লেবুর মৌসুম নয়, তাই এই পণ্যের দাম বাড়তি থাকতে পারে।
নিউমার্কেট নিত্যপণ্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, দেশের মানুষ এখন ৮ থেকে ১০টি বড় করপোরেট কোম্পানির হাতে জিম্মি। আর ব্যবসা করতে এমন মানুষকে চাঁদা দিতে হয় যে তা কাউকে বলা যায় না। তবে ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আফরোজা রহমান বলেন, ঢাকা মহানগরসহ জেলা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে। রমজান মাসে এই তদারকি আরও জোরদার করা হবে।
রমজানকে কেন্দ্র করে বাজার মূল্যের দিকে সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার। শুধু বাজার মূল্য নয়, জিনিসপত্র আনা নেওয়া আরও কীভাবে সহজ করা যায় সে বিষয়েও কাজ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য একটি বড় ইস্যু। চেষ্টা করতে হবে কীভাবে এটাকে আয়ত্তে আনা যায়। পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কোন্ কোন্ দ্রব্যের অভাব হলে মানুষের কষ্ট হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেসব তৎপরতা বা অভিযান বাজারকে প্রভাবিত করতে পারছে বলে এখনো অনুভূত হয়নি। মূল্য পরিস্থিতি ভোক্তার কাঙ্ক্ষিত নাগালের মধ্যেই আসছে না! আসন্ন রমজান মাসের সম্ভাব্য সংকটের কথা চিন্তা করে সাধারণের মধ্যে দিশাহারা মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের কথিত সিন্ডিকেট কর্তৃক দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত চক্রপ্রবাহের মধ্যে পড়ে সাধারণের স্বস্তিও দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে! ভরসা একটাই, অন্তত সরকার বাজার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে।








