রবীন্দ্রকাব্যে বসন্ত : প্রকৃতির নবজাগরণ

কুমুদিনী কলি | সোমবার , ২ মার্চ, ২০২৬ at ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; যার নামেই বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ, পরিপূর্ণ, অভিনব আভিজাত্যে অভিজাত। বাংলা সাহিত্যে নানা অনুষঙ্গে তিনি তাঁর সমৃদ্ধ লেখনীর প্রয়াস ঘটিয়েছেন, অভিনব, আধুনিক ধারার প্রবর্তন করেছেন। মহাকাব্য ছাড়া সাহিত্যের সবকটি শাখায় তার নানন্দনিক প্রকাশ। তিনি অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়কেও আলোচনার দক্ষতায়, প্রকাশভঙ্গির স্বাচ্ছন্দ্যে বাংলা সাহিত্যের আলোকিত বিষয় হিসেবে পরিণত করেছেন অনায়াসে। তাঁর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যময়তা তাঁকে অনন্য উচ্চতা দান করেছে অনায়াসে।

প্রকৃতি ও মানবজীবন তথা মানবমনকে তিনি এক সুতায় গেঁথে নিয়ে যে মালা তৈরী করেছেন, যুগ যুগ ধরে বাঙালি সেই মালা গলায় ধারণ করেছেন, নিজেকে অভিজাত করেছেন, নিজের মনোভাবকে প্রকাশ করেছেন তাঁর ভাষায়, তাঁর গানের সুরে, তাঁর ছন্দে।

বাংলা সাহিত্যে বসন্ত তেমনি এক উচ্চকিত বিষয়, যাকে নিয়ে অজগ্র গান, কবিতা, নাটক, সংলাপ, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য প্রভৃতি রচনা করেছেন তিনি।

রাজকীয় ধারায় বসন্তকে উপস্থাপন করা তাঁর অনন্য সৃষ্টিশীলতার আরও একটি ধারা। যাতে করে বাঙালির বসন্ত বন্দনা মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনিবার্য এক নাম। আজও তাঁর বসন্ত বন্দনা আমাদের সবার মনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করে।

অযুত বৎসর আগে, হে বসন্ত, প্রথম ফাল্‌গুনে

মত্ত কুতূহলী

প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণদুয়ার

মর্তে এলে চলি—-

অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের কুটিরপ্রাঙ্গণে

পীতাম্বর পরি,

উতলা উত্তরী হতে উড়াইয়া উন্মাদ পবনে

মন্দারমঞ্জুরী

দলে দলে নরনারী ছুটে এল গৃহদ্বার খুলি

লয়ে বীণা বেণু,

মাতিয়া পাগল নৃত্যে হাসিয়া করিল হানাহানি

ছুঁড়ি পুস্পরেণু—’

আরও নানা ভাবে, নানা উপমায়, কথায়, ছন্দে, সুরে বসন্তকে আরও বর্ণিল, আরও অভিজাত করে তুলেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বসন্তকে এতটা উজ্জ্বল করে, এতটা নান্দনিকভাবে বাংলা সাহিত্যে এনে বসিয়েছেন, আলোকিত করে তুলেছেন অন্যান্য ঋতুদের থেকে, বাংলা সাহিত্যে বসন্তকে নিয়ে এত বিস্তৃত করে আর কেউ হয়তো ভাবেন নি। তাঁর ভাবনায় বসন্ত নানা রঙে, নানা বৈচিত্র্যে পাঠক সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

কোথাও বসন্তকে তিনি প্রাণের প্রথম জাগরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেখানে গাছে গাছে নতুন পাতার মতো জাগরিত হয় নতুন বাসনা, নতুন ভাবনা। টানটান বসন্তের মাতাল বাতাসের সাথে মানবমনের বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন ও তাঁর নজর এড়িয়ে যায়নি।

প্রকৃতির সাথে কতটা একাত্ম হলে জীবনের নানা অনুষঙ্গে তিনি প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময়তাকে নানা ভূষণে ভূষিত করতে পারেন সমান দক্ষতায়।

শীত শেষের জরাজীর্ণ প্রকৃতি তথা মানবজীবনকে নব ভাবনায় উজ্জীবিত করে বসন্ত। প্রকৃতির ঝরে যাওয়া হলুদ রঙা পাতার শূন্যস্থান পূরণ করে নেয় কচি সবুজের অঙ্কুরিত জীবন তথা জীবনবোধ। এই বোধ অঙ্কুরিত হয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে। কচিসবুজে ধরে দৃঢ়তার গাঢ় ঘন সবুজ রঙ। দোলায়িত হয় বসন্ত বাতাসে।

শীতের অবগুণ্ঠন উন্মোচনের পর হঠাৎ বসন্তের আগমন যেনো এক নতুন অধ্যায়। বাতাসে কিসের যেনো শিরশিরে অনুভূতি, ফুলের গন্ধ, মন উতলা হয়ে যাওয়া সময়, খসখসে জীর্ণ প্রকৃতির গায়ে যেনো হঠাৎ লাবণ্য আসতে শুরু করা।

পাতাহীন জরাজীর্ণ প্রকৃতিতে কিসের যেনো উপস্থিতি সদা সর্বদা টের পাওয়া যায়। আর তাতে এমন এক ব্যস্ততা, যেনো পুরো প্রকৃতি জুড়েই ঘটে চলেছে এক নীরব আয়োজন। কাকে যেনো গ্রহণ করার অব্যক্ত বাসনা, কাকে যেনো বরণের এক প্রাণপণ প্রচেষ্টা।

এ যেনো নতুন বছরকে নতুন পৃথিবী উপহার দেবে বলে বসন্তের এক বর্ণিল আয়োজন। মানবমনের সাথেও প্রকৃতির এই আয়োজন নানাভাবে ওতোপ্রোতো ভাবেই জড়িত। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তা নানা অভিব্যক্তিতে বর্ণনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করতে পারতেন। আর তাঁর উপলব্ধি করার ক্ষমতা তাঁকে বাকিদের থেকে ভিন্ন করে তুলেছে। তাঁর বেশিরভাগ সাহিত্যে বসন্তের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তাঁর মায়ার খেলা গীতিনাট্যে-‘আহা আজি এই বসন্তে, এতো ফুল ফোঁটে, এতো বাঁশি বাজে এতো পাখি গায়।’

চিত্রাঙ্গদা কাব্যে নানাভাবে বসন্তকে তিনি মানবজীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছেন। চিত্রাঙ্গদার মনে প্রেমের প্রথম অভিষেক নিয়ে সখীদের প্রতি তার আকুল আবেদন কোনো না কোনোভাবে মিলে গেলো শীত শেষের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতির বসন্তে পদার্পণের বিষয়টির সাথে।

দে তোরা আমায় নূতন করে দে নূতন আভরণে।

হেমন্তের অভিসম্পাতে রিক্ত অকিঞ্চন কাননভূমি

বসন্তে হোক দৈন্যবিমোচন নবলাবণ্যধনে।

শূন্য শাখা লজ্জা ভুলে যাক পল্লব আবরণে!’

মানবজীবনের প্রায় প্রতিটি অনুষঙ্গকে প্রকৃতির রূপ, রস, ছন্দ অলংকারের সাথে তিনি মিলিয়ে নিয়েছেন।

চন্ডালিকা’ নৃত্যনাট্য শুরুই হলো বসন্ত বন্দনার মধ্য দিয়ে। প্রথম দৃশ্যে ফুলওয়ালীদের মুখেই বিস্তৃত এক বসন্ত বন্দনা।

নব বসন্তের দানের ডালি এনেছি তোদেরই দ্বারে,

আয় আয় আয়

পরিবি গলায় হারে।

——————–

আমার মালার ফুলের দলে আছে লেখা

বসন্তের মন্ত্রলিপি।’

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীও শুরু হলো বসন্তবন্দনা দিয়ে।

বসন্ত আওল রে! মধুকর গুন গুন, অমুয়ামঞ্জুরী কানন ছাওল রে।’ নাট্যগীতিসমুহেও বসন্তের বিস্তারিত বিবরণ দেখতে পাওয়া যায় বৈকি! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত ঋতুকে প্রকৃতির নবযৌবন ও প্রাণের উৎসব হিসেবে দেখেছেন। তিনি মনে করেন, বসন্ত মানেই পূর্ণতা, বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। তাই তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে প্রকাশ করেনহে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরণীর ধ্যানভরা ধন, বৎসরের শেষে শুধু একবার মর্তে মূর্তি ধর ভুবনমোহন নববর বেশে।’

বসন্তে আমাদের মন অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যায়, বাতাসের উপর ভাসিতে থাকে, ফুলের গন্ধে মাতাল হইয়া জ্যোৎস্নার মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ে।’ কবিগুরু ছাড়া বসন্ত অসম্পূর্ণ।

ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘ফাল্‌গুনী’ নাটকে বসন্তের উচ্ছ্বলতা এবং ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’এর ‘বসন্ত যাপন’এ প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁর সমগ্র সাহিত্যে বসন্তের সরব উপস্থিতি বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ। তাঁর মতো করে বসন্তকে রাজকীয় ভাবে আর কেউ তুলে ধরতে পারেন নি। বাংলা সাহিত্যে এ এক অনন্য সংযোজন।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরমজান ও আত্মসংযম
পরবর্তী নিবন্ধনির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতি : সমস্যার ব্যাপকতা