ইংরেজি সাহিত্যে ভিক্টোরীয় যুগ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের যুগ। এই যুগে মানব মনের জটিলতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব, লুকায়িত বাসনা ও আত্মপ্রকাশের আকাঙ্খা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এই নতুন ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন রবার্ট ব্রাউনিং। তিনি ড্রামাটিক মনোলগকে শুধু একটি কাব্যরীতি হিসেবে ব্যবহার করেন নি, বরং এটিকে শৈল্পিক ধারার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। এ রীতি মনের গভীরে অদৃশ্য এক আয়নার মতো যেখানে বক্তা নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে অজান্তেই নিজের আত্মাকে উন্মোচিত করেন সুন্দর এক কাব্যরীতির মাধ্যমে। তাঁর কবিতায় কবি নিজেই এবং দর্শকরা নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করেন যেখানে বক্তা নিজেই নিজের চরিত্র উন্মোচনের মাধ্যমে কবিতায় একটি নাটকীয় আবহের সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ মনোলগ এমন এক কাব্যরীতি যেখানে একজন বক্তা নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং পরিস্থিতিতে নিজেই নাটকীয়ভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন, আর সেক্ষেত্রে শ্রোতা নীরব থাকেন, অনেকটা অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। রবার্ট ব্রাউনিং মানব মনের অন্ধকার গলিপথে আলো হয়ে বিচরণ করেছেন। তাঁর কবিতার চরিত্রগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে বহমান নদীর মতো শান্ত, তবে অন্তর্নিহিত আবেগময়তায় ছিল স্রোতস্বিনী। রাজা, ডিউক, শিল্পী, ধর্মযাজক কিংবা পাগল সকলের মুখে কবি কন্ঠস্বর তুলে দিয়েছেন।
বক্তার বাচনভঙ্গি, ভাষা ও যুক্তি এবং আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের মাধ্যমেই তাঁর চরিত্র, মানসিক ও নৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে চরিত্র সৃজনের মাধ্যমে মনস্তত্ত্বের ক্রমক্রমিক ধারা, নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ, আত্মসংযমের ইঙ্গিত সহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যার পূর্ণতার প্রকাশ ঘটে ব্রাউনিং‘র হাতে। এক্ষেত্রে ব্রাউনিং‘র ভাষা শৈলী স্বাভাবিক গতানুগতিকতার তুলনায় অনেকটা কঠিন, ঘনীভূত ও বুদ্ধিবৃত্তিক। সহজ সরল ব্যঙময়তার চেয়ে যুক্তি, প্রশ্ন ও দ্বন্দ্ব তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন একজন মানুষের সত্যিকার রূপ বোঝা যায় সংকটের মুহূর্তে। তাঁর কবিতার বক্তারা তাই কখনো স্বৈরাচারী, কখনো অহংকারী, আবার কখনো ঈর্ষান্বিত। আবার কেউবা ছিল আত্মবিশ্বাসে অধিক আস্থাবান। আর এহেন বৈপরীত্যের ধারাই ছিল তাঁর কাব্যের প্রাণ। ব্রাউনিং ‘ র সর্বাধিক আলোচিত কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কবিতা হলো “মাই লাস্ট ডাচেস” এই কবিতায় একজন ইতালীয় ডিউক অতিথির সামনে তাঁর মৃত স্ত্রীর প্রতিকৃতি দেখিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কথায় ফুটে ওঠে তাঁর ঈর্ষা, অধিকারবোধ ও নিষ্ঠুরতা। তিনি বলেন : “That’s my Last Duches, painted on the well, Looking as if she were alive“. এই সহজ সরল বাক্যের আড়লেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ ইঙ্গিত। তিনি তাঁর নিজের মনের নিষ্ঠুরতা ও স্বৈরাচারী মানসিকতা প্রকাশ করেন। ডিউক তাঁর স্ত্রীর হাসি, সৌজন্যবোধ ও সরলতাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তিনি বললেন : “She had a heart-how shall I say? too soon. made glad – too easily impressed;” এই বর্ণনার মধ্য দিয়ে ডিউকের অহংকার, সন্দেহ প্রবণতা ও দমনমূলক মনোভাব স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে। কোমল শীতল উচ্চারণে তিনি বলেন : “I gave commands Then all smiles stopped together.” ছোট্ট দুটি লাইনেই নিহিত তাঁর নিষ্ঠুর হত্যার ইঙ্গিত। মূলত ব্রাউনিং‘র কাব্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো প্রায়ই জটিল দ্বিধা দ্বন্দ্বে আচ্ছন্ন এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সাহসিকতাপূর্ণ লেখনীর মাধ্যমে তিনি মানুষের মনের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচিত করেছেন।
পরফিরিয়াস‘স লাভার কবিতায় প্রেমিকের মানসিক বিকৃতি ও বিকৃত যুক্তিবোধ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এই কবিতায় এক প্রেমিক ঝড়ের রাতে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী পরফিয়াকে তাঁরই চুল দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। বক্তা যুক্তি দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন তিনি নাকি প্রেমকে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন যার মধ্যে তাঁর স্বৈরাচারী আচরণ প্রতিভাত হয়েছে। প্রেমিক বলেন : “That moment she was mine, mine, fair Perfectly pure and good.” এখানে প্রেমের প্রকাশ বোধ নান্দনিক হলেও প্রেমিক হৃদয়ের ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা বিধৃত হয়েছে। আত্মকেন্দ্রিক প্রেম ধীরে ধীরে সহিংস উন্মত্ততায় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। বক্তার যুক্তিতে পাঠক বিচলিত হলেও বক্তার বক্তব্যে কোনো অনুশোচনার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এনড্রেরিয়া ডেল সার্টো কবিতায় ব্রাউনিং চিত্রিত করেন এক প্রতিভাবান আত্মবিশ্বাসহীন চিত্রশিল্পীর আত্মকথন। কবির বর্ণিত এনড্রিয়া কারিগরি নৈপুণ্যে নিখুঁত থাকলেও তাঁর শিল্পে যেন অনুপস্থিত আত্মার আগুন। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন : “Ah, but a man’s reach should exceed his grasp Or what’s heaven for?” এই বিখ্যাত উক্তির মাঝে ব্রাউনিং শিল্প ও জীবনের দর্পন নিয়ে বর্ণনায় প্রকাশ করেন। কোনো বিষয়েই নিখুঁত উপমা যথেষ্ট নয়, মহৎ অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য প্রয়োজন উচ্চাশা ও ঝুঁকি। এখানে বক্তার হতাশ কন্ঠেই শিল্পীসত্তার অন্তর্দ্বন্দ্ব মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।
“ফ্রা লিপ্পো লিপ্পি ” কবিতায় ধর্মযাজক চিত্রশিল্পী সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি মানুষকে শিল্পে ফুটে উঠা উচিত। তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে :
“This world’s no blot for us Nor blank, it means intensely, and means good. এখানে ব্রাউনিং বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে তা গ্রহণ করার আহবান জানান। বক্তার প্রাণবন্ত, রসাত্মক ও বিদ্রোহী ভাষা কবিতাটিকে নাটকীয় রূপ এনে দেয়। দ্যা বিশপ অর্ডারস হিজ টম্ব (The Bishop Orders his Tomb) এক ধর্মগুরু মৃত্যুশয্যায় শুয়েও ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা, ভোগবিলাসের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। তাঁর কথাতেই ধর্মীয় ভণ্ডামির রূপটি ফুটে ওঠে : “As still she envied me, so fair she was.” চার্চের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র এই লাইনটিতে ফুটে উঠেছে।
মানুষের অন্তর্জগতে মনস্তত্ত্ব, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও আত্মপ্রবঞ্চনার জটিলতা ব্রাউনিং‘র কবিতায় অনন্য ধারায় ফুটে উঠেছে। নাটকের মতো সংলাপ ভিত্তিক অথচ একক বক্তার কন্ঠে ধ্বনিত এসব কবিতা পাঠককে কেবল কবিতার কাহিনি নয়, বক্তার চরিত্র ও মানসিকতা অনুধাবনে সহায়তা করেছে। নিছক কবিতার স্তর থেকে তুলে এনে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের উচ্চতায় উন্নীত করেছেন ব্রাউনিং এ কাব্যরীতিকে। তাঁর কবিতাগুলো প্রায়শই আত্মবিশ্বাসী, যদিও কখনো বা নিজেদের অজান্তে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। মানব মনের গভীর সংকট তাঁর ইতিহাস, ধর্ম ও সমাজ থেকে চরিত্র নির্বাচনের কেন্দ্রেই সুনিপুণভাবে গ্রথিত।
রবার্ট ব্রাউনিং ড্রামাটিক মনোলগকে নিছক কাব্যরীতি হিসেবে নয় বরং মানব মনের গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রেম, ক্ষমতা, শিল্প, ধর্ম ও নৈতিকতার জটিল দ্বন্ধ বাস্তব ও জীবন্ত হয়ে উঠে। ভিক্টোরীয় যুগের সীমা অতিক্রম করে ব্রাউনিং‘র ড্রামাটিক মনোলগ আজও আধুনিক পাঠক সমালোচকদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও নন্দিত। মানবচরিত্রের রহস্যময়তা অনুসন্ধানে তিনি চিরকালীন এক অনন্য শিল্পী। মোটকথা ব্রাউনিং তাঁর সৃষ্ট কবিতায় এই রীতিকে পূর্ণতা দিয়েছেন। ব্রাউনিং‘র কাব্যরীতির অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিক নিরপেক্ষতা। তিনি কখোনও সরাসরি চরিত্রের পক্ষে বিপক্ষে মত দেননি, বরং চরিত্রের মাঝে নিজের স্বকীয়
ও স্বাচ্ছন্দ্য ময় রূপ ফুটিয়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যে ভিক্টোরীয় যুগ নানাদিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হলেও যে কজন কবি একটি মৌলিক রীতির জন্ম দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে রবার্ট ব্রাউনিং অন্যতম। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় বিভিন্ন কবিতার প্রাসঙ্গিকতায় রবার্ট ব্রাউনিং ড্রামাটিক মনোলগের একজন সার্থক লেখক। ঊনবিংশ শতাব্দীই ছিল ইংরেজি সাহিত্যে নবজাগরণ শিল্পবিপ্লব ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার যুগ। আর সে যুগেই জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক মহান কবি যিনি কবিতাকে আবেগের সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে মানুষের অন্তর্লোক, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের ভাবাবেগ, নৈতিক সংকট ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সূক্ষ্ম স্তরগুলোর সুনিপুণ প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি হলেন রবার্ট ব্রাউনিং যিনি কবিতার জগতে ড্রামাটিক মনোলগের শ্রেষ্ঠ স্থপতি।
লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, প্রাক্তন অধ্যক্ষ, রাংগুনিয়া সরকারি কলেজ এবং বর্তমানে রেক্টর, বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।











