রফতানি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি

| রবিবার , ২৯ মার্চ, ২০২৬ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ

এ কথা আজ অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশ মূলত কৃষিপ্রধান দেশ হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্প স্থাপন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এক্ষেত্রে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান অপরিসীম। সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। রফতানি বাণিজ্যেও তৈরি পোশাক শিল্পের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বেকার সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই শিল্প। এ শিল্পের হাত ধরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে পেয়েছে নতুন পরিচিতি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এই খাত। তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বস্ত্র, সুতা, আনুষঙ্গিক উপকরণ, প্যাকেজিং ইত্যাদি শিল্পেরও ঘটেছে সমপ্রসারণ। এর বাইরেও পরিবহন, ব্যাংকিং, শিপিং এবং ইন্স্যুরেন্স সেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এ খাতের সংকট বা অস্থিরতা কখনো কাম্য হতে পারে না।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দেশের তৈরি পোশাক রফতানি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিন ধরে এর প্রধান গন্তব্যগুলোয় রফতানি তুলনামূলক কমছে। এর পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতা, মার্কিন শুল্কনীতি ও রফতানিতে চীনভারতের আগ্রাসী কৌশল ইত্যাদি কারণে বিশ্ববাজারে এক ধরনের মন্দাবস্থা তৈরি হয়েছে। উপরন্তু সমপ্রতি যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত। এর প্রভাব পড়ছে দেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে। আর তৈরি পোশাক দেশের প্রধান রফতানি পণ্য হওয়ায় এর নিম্নমুখিতা পুরো রফতানি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এ নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে একক দেশ হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মোট রফতানীকৃত পোশাকের প্রায় ২০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশটিতে পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ৫০৩ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫০৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রফতানি কমেছে দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এ সময়ে দেশগুলোয় পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ২৬৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার মূল্যের, যেখানে ২০২৪২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ১ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পণ্য। এর বাইরে কানাডা ও যুক্তরাজ্য এবং কিছু অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রফতানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিম্নমুখী। এসব মিলিয়ে টানা আট মাস ধরে সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এ সময় রফতানি ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে বলে ইপিবির তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এতে আগে থেকে বহুমুখী চাপে থাকা দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়ছে। কেননা দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের অন্যতম উৎস হলো রফতানি আয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশের বাজারে আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত হলো জুতা শিল্প। এটি দ্বিতীয় বৃহৎ রফতানিমুখী শিল্প খাত না হয়ে ওঠার কারণ হচ্ছে, রপ্তানিতে আমাদের একটা নিরীহ ব্যবস্থা ধরে রাখা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় রপ্তানি করলে মুনাফার হার বেশি হয় না। দেশীয় বাজারে বিক্রি করলে যে লাভ হয় রপ্তানি তা হয় না। কিন্তু রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করলেই আমাদের জুতা শিল্প বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো এবং এতে তৈরি পোশাক খাতের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। প্রথমত কথা হলো, বাণিজ্য শুল্ক দিয়ে দেশীয় বাজারকে লাভজনক করে রাখার ব্যবস্থাটা ভালো নয়। এতে রপ্তানি করার প্রণোদনা হারান উৎপাদকরা। দ্বিতীয়ত, দেশীয় বাজার আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অনেক ছোট। এখানে শিল্পের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু মুনাফা করা নয়। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। রফতানিমুখী শিল্পে যেমন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়, দেশীয় শিল্পে এ রকম কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার অনেক বড় হয়েছে। এখন তা ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ের তুলনায় দেখলে বেশ বড়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার হচ্ছে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের। আমাদের তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়েই এগোনো উচিত। এতে যেমন অসংখ্য কর্মসংস্থান হবে তেমনি বড় হবে আমাদের অর্থনীতির আকার। তাই বাংলাদেশের রফতানি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে