রণদা প্রসাদ সাহা : মেধা ও পরিশ্রমে জিরো হতে হিরো

সুজিত চৌধুরী | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ

রণদা প্রসাদ সাহা একসময় কলকাতার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ডাব বিক্রি করতেন এবং রিকশা চালাতেন। সেই একই মানুষ যখন পরবর্তীতে তার বিশাল জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসতেন, তখন বন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে বিশেষ সম্মানের সাথে গ্রহণ করত। একজন অতি সাধারণ রেলশ্রমিক থেকে নিজের মেধা ও পরিশ্রমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের অন্যতম শীর্ষ ধনী। তবে তার বড় পরিচয় তিনি তার অর্জিত সমস্ত সম্পদ মানুষের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন!

১৮৯৬ সালে ঢাকার অদূরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক অতি সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ছিল কষ্টে ভরা। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। মাতৃহীন রণদা দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি। অভাবের তাড়নায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। তিনি কোলকাতায় কুলি হিসেবেও কাজ করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগ দেন এবং মেসোপটেমিয়ায় যুদ্ধে যান। সেখানে তিনি অসাধারণ সাহসিকতা দেখিয়ে অফিসার পদে উন্নীত হন।

যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি সরকারের কাছ থেকে কিছু অর্থ পান। সেই পুঁজি দিয়ে তিনি কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি জাহাজ ব্যবসা এবং পাটের ব্যবসায় বিপুল সাফল্য অর্জন করেন। রণদা প্রসাদ সাহা তার ব্যবসায়িক সফলতার একটি বড় অংশ অর্জন করেছিলেন নৌপরিবহন বা রিভার সার্ভিসের মাধ্যমে।

যখন তার বেঙ্গল রিভার সার্ভিসশুরু করেন, তখন এটি ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নৌপরিবহন কোম্পানি। সে সময়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য তার জাহাজের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। ১৯৩০এর দশকের মধ্যেই তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি তার ব্যবসার শুরুর দিকে কোলকাতা ও এর আশেপাশের অঞ্চলে লবণ ও কয়লার ডিলারশিপ নিয়ে কাজ করতেন। বাংলাদেশে ট্যানারি শিল্প এবং পাট ব্যবসার আধুনিকায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ধনকুবের হওয়ার পর রণদা প্রসাদ সাহার জীবন বিলাসিতায় কাটতে পারত, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন ত্যাগের পথ। তার মায়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু তাকে ব্যথিত করেছিল, তাই তিনি সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রসারে মন দেন। ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তিনি মায়ের নামে ৭৫০ শয্যার একটি বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তখন বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হতো। মেয়েদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে তিনি নারী শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ভারতেশ্বরী হোমস্‌প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের সমস্ত ব্যবসা ও স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তি তিনি ‘কুমুদিনী কল্যাণ ট্রাস্ট’এর নামে লিখে দেন। তার এই ত্যাগের কারণে মানুষ তাকে ভালোবেসে ‘দানবীর’ উপাধি দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। ৭ মে ১৯৭১ সালে তাদের দুজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশের জন্য তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেন, যার প্রতিদানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকদেওয়া হয়!

রণদা প্রসাদ সাহার জীবনের মূল শিক্ষা শূন্য থেকে শুরু। ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ। অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে অমর হয়ে আছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএক দশকের আলোকযাত্রা : স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশন
পরবর্তী নিবন্ধশানে রেসালাত বোঝার ঈমানী ও মানবিক দৃষ্টি