রণতরী জেরাল্ড ফোর্ডে নাবিকরাই আগুন দিয়েছে?

তদন্তে মার্কিন নৌবাহিনী

| বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ

জেরাল্ড আর ফোর্ডে থাকা নাবিকরাই ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটিতে আগুন দিয়েছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক তদন্তে নেমেছে মার্কিন নৌবাহিনী। গত বৃহস্পতিবার লাগা এ আগুন নেভাতে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে, ৬০০রও বেশি ক্রু সদস্যকে বিছানা হারাতে হয়েছে, প্রায় ১১ মাস টানা সমুদ্রে থাকার পর বিমানবাহী রণতরীটিকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গ্রিসের পথ ধরতে হয়েছে, বলছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান ‘মহাতাণ্ডব অভিযানে’ সহায়তা লোহিত সাগরে থাকা অবস্থায় জাহাজের প্রধান লন্ড্রি কক্ষে লাগা আগুনে প্রথমে দুই নাবিক আহত হওয়ার কথা জানানো হয়, পরে তৃতীয় আরেকজনকে উন্নত সেবার জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। আগুনটি ‘সংঘাতসংশ্লিষ্ট নয় এবং নিয়ন্ত্রণে এসেছে’ বলে পরে জানায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। তবে কী কারণে আগুন লেগেছে তা জানায়নি তারা; তদন্তকারীরা এখন ওই ফাঁক পূরণে কাজে নেমেছেন।

১১ মাস ধরে সমুদ্রে: নিয়ম অনুযায়ী গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন বাহিনীর ইউরোপিয়ান কমান্ডের অধীনে মোতায়েন হয় জেরাল্ড ফোর্ড। কিন্তু অক্টোবরে হুট করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ রণতরীটিকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যেতে নির্দেশ দেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ অভিযানে সহায়তা করতে। ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ক্রুদের জানানো হয়, মার্চের শুরুর দিকেই তারা বাড়ি ফিরতে পারতে পারবেন। কিন্তু এর ১২ ঘণ্টার মধ্যেই নির্দেশ বদলে যায়। রণতরীটিকে এবার পাঠানো হয় ভূমধ্যসাগরে, পরে লোহিত সাগরে, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলযুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সহায়তা দিতে। খবর বিডিনিউজের।

তাদের মোতায়েনকাল ১১ মাসে পৌঁছাতে পারে বলে সেনেটের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটিকে বলেছিলেন ভাইস চিফ অব নেভাল অপারেশনস অ্যাডমিরাল জেমস কিলবি; ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আর কোনো রণতরীকে এতটা দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হয়নি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধপরবর্তী সবচেয়ে বেশি সময় সমুদ্রে মোতায়েন থাকার রেকর্ড আপাতত ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের, ২৯৪ দিন। ১২ মার্চ আগুন লাগার দিন ফোর্ডের মোতায়েনকাল চলছিল ২৬২ দিন; মের শুরু পর্যন্ত থাকলে এটি ৩৩০ দিনের কাছাকাছি পৌঁছে যেত, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারত যুদ্ধকালীন টনকিন উপসাগরে মোতায়েন থাকা রণতরীর রেকর্ডের সঙ্গে। তবে প্রস্তুতিবিহীন এ দীর্ঘ সময় যে বেশ ক্ষতিকর, জানুয়ারিতেই সারফেস নেভি অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সিম্পোজিয়ামে সতর্ক করেছিলেন নেভাল অপারেশনসের প্রধান অ্যাডমিরাল ডেরিল কডলে।

দীর্ঘকাল সমুদ্রে অবস্থান যে নাবিকদের মনস্তত্ত্বেও বিরাট প্রভাব ফেলে তা স্বীকার করে নিচ্ছেন মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ টুয়েলভের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল পল লানজিলোতাও। ক্লান্তি জমতে থাকে এবং বাড়ি থেকে দূরে থাকার ভার নাবিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে। নেতা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের সহায়তা নিশ্চিত করাযেন জাহাজে থাকা অবস্থায় তারা সব ধরনের সেবা পান, স্পষ্ট যোগাযোগ, নিয়মিত আলোচনা করা, ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে এমনটাই বলেছিলেন লানজিলোতা।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর জেরাল্ড ফোর্ডে থাকা এক নাবিকের অভিভাবক ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) বলেছিলেন, তারা ক্লান্ত। আগুন অবশ্যই তাদের মনোবলে প্রভাব ফেলেছে, শেষবার মেয়াদ বৃদ্ধির তুলনায় মনোবল অনেক কমিয়েছে।

আগুন, ক্ষয়ক্ষতি এবং নাশকতা তত্ত্ব: ধারণা করা হচ্ছে, গত ১২ মে জেরাল্ড ফোর্ডের মূল লন্ড্রির স্থানে আগুন লাগে। মার্কিন নৌবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সেদিনই বাহরাইনের মানামা থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, অগ্নিকাণ্ডে আহত দুই নাবিককে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তাদের কারও অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। আগুনে প্রপালশান প্ল্যান্টের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেও তারা নিশ্চিত করে। বলে, জাহাজটি ‘পুরোপুরি কার্যক্ষম’ রয়েছে। তবে আগুনের কারণ বলেনি তারা। তবে কার্যত ওই আগুনের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি যে বিবৃতিতে দেওয়া তথ্যের চেয়েও বেশি পরে তা জানা যায়। মঙ্গলবার নেভি টাইমস জানায়, আগুন বায়ুচলাচল ব্যবস্থার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘুমানোর কক্ষগুলোর এতটাই ক্ষতি করে যে, ছয়শর’ও বেশি নাবিক মেঝে ও টেবিলে ঘুমাতে বাধ্য হন। নৌবাহিনী তড়িঘড়ি নির্মাণাধীন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জন এফ কেনেডি থেকে ম্যাট্রেস আনতে ছোটে। কয়েক ডজন ক্রু সদস্য ধোঁয়ার বিষক্রিয়ায় ভোগেন। এরপরও মার্কিন নৌবাহিনী কেবল তিনজন আহতের খবরেই সীমাবদ্ধ থাকে।

আগে থেকেই চাপে থাকা রণতরী: নাশকতার তদন্ত হাওয়া থেকে শুরু হয়নি। মাসের পর মাস ধরে জেরাল্ড ফোর্ড যুদ্ধজাহাজটিতে কিছু জটিল প্রযুক্তিগত ও মানবিক চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, যা এখন আগুনের তদন্তের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার কথা জানা যাচ্ছে, সেটি হল জাহাজটির পয়ঃনিষ্কাশন (ভিসিএইচটিএস) ব্যবস্থার ত্রুটি। ২০২০ সালেই জেনারেল অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস এই ব্যবস্থাটিকে আকারে ছোট এবং নকশায় ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়েছিল। সর্বশেষ মোতায়েনের পর থেকে এই ব্যবস্থাটি মেরামতের অনুরোধ জানিয়ে গড়ে প্রতিদিন একটি করে অভিযোগ জমা পড়েছে, বলছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস।

জেরাল্ড ফোর্ড ২০২৩ সাল থেকে ৪২ বার বাইরের সহায়তা চেয়েছে, যার মধ্যে ৩২ বারই সাহায্য চাওয়া হয়েছে ২০২৫ সালে। এনপিআরএর দেখা একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইলে চারদিনের মধ্যে ২০৫ বার এই পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিকল হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর সরু পাইপগুলোতে টিশার্ট ও চার ফুট লম্বা দড়ির টুকরোর মতো জিনিস আটকে থাকতে দেখা গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলাভার মহাসাগরে ঘেরা নতুন গ্রহের খোঁজ পেলেন বিজ্ঞানীরা
পরবর্তী নিবন্ধচবি সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আর নেই