রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ১৫

টাঙ্গাইলে দুর্ঘটনা ঈদে বাড়ি ফিরছিলেন তারা, নিহতদের ১০ জন নওগাঁর চাঁপাই যেতে কয়েকজন উঠেছিলেন নগরীর অলংকার থেকে

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ২৬ মে, ২০২৬ at ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ

ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকাটাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের ১০ জন নওগাঁর। আহতরা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।

টাঙ্গাইলের যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানি জানান, নিহতদের মরদেহ মর্গে রাখা আছে। নিহতদের পরিবার এসে শনাক্ত করার পর তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ওই যাত্রীরা ঈদের ছুটি কাটাতে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। মূলত যাতায়াত খরচ কমানোর জন্যই তারা এভাবে ভ্রমণ করছিলেন। পুলিশ বলছে, লুকিয়ে ট্রাকে করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছিল। এই ঘটনায় তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। এদিকে ট্রাকের এক যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেছেন, ট্রাকটি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলা যাবে। আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অলংকার থেকে উঠেছিলাম। মূলত বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা চাওয়া হয়। কম টাকার জন্য আমরা ট্রাকে উঠি। আমরা চারজনে ২৩০০ টাকা দেই। আমার দুজন মারা গেছে। খবর বিবিসি বাংলা ও বিডিনিউজের।

আহত এবং ওই ট্রাকে থাকা অন্যান্য যাত্রীদের সাথে কথা বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী জানতে পেরেছে, ওই ট্রাকের যাত্রীদের বেশির ভাগের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়। মান্দা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, নিহতদের অধিকাংশই মান্দা উপজেলার। শোনা যাচ্ছে, অন্তত ১৩ জনের বাড়ি মান্দায় হতে পারে।

এলেঙ্গা ফায়ার স্টেশনের ইনচার্জ আতাউর রহমান জানান, গতকাল ভোর ৪টা ৫ মিনিটে দুর্ঘটনার খবরটি পান এবং এরপর ঘটনাস্থলে যান। আমরা গিয়ে দেখি ট্রাকটা উল্টে পড়ে আছে। ট্রাকটা রডবোঝাই ছিল। ওই রডের উপর যাত্রীরা বসে ছিল। জীবিতদের ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জেনেছি, ট্রাকটিতে ২৫২৬ জন যাত্রী ছিল। এদের কয়েকজন ছিটকে পড়ে ও আহত হয়। বাকি ২১ জন পড়ে রডের নিচে।

স্থানীয় ও পুলিশের সহযোগিতায় ট্রাকের তল থেকে সবাইকে বের করা হয়। কিন্তু উদ্ধারকৃতদের ১৫ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাদের মরদেহ যমুনা সেতু পূর্ব থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বাকি ছয়জনকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানান, তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন ওই ট্রাকের প্রায় সবার বাড়ি নওগাঁ, রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায়। দুর্ঘটনার কারণ জানা গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। হতে পারে ড্রাইভার ঘুমাচ্ছিল বা কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। কারণ ট্রাকটি অন্য কোনো গাড়ির সাথে লাগেনি। সামনেপেছনে কোনো আঘাত নেই। যারা গাড়িতে ছিল তারাও বলছে, গাড়ির সাথে অন্য কিছু লাগেনি। তবে ওই ট্রাকের ড্রাইভার ও ড্রাইভারের সহকারী ঘটনার পরপরই পালিয়েছে। ড্রাইভার ও ড্রাইভারের সহকারী খুব বেশি আহত হয়নি শুনেছি। যাত্রীরা আহত হয়েছে। কারণ তারা ছিল রডের উপরে ও পেছনে।

টাঙ্গাইলের স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান ঘটনাস্থলে ওই ট্রাকের যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানান, কম টাকার জন্য তারা ট্রাকে উঠেছিলেন। এক যাত্রী বলেন, আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে দেখি ট্রাকটি উল্টে গেছে। এর পরে আর কিছুই বলতে পারব না। আমরা ট্রাকে ২২ জন যাত্রী ছিলাম।

সড়ক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দুর্ঘটনার মূল দায় মালিক সমিতিকে দিয়েছেন। তার ভাষায়, এখানে স্পষ্টত মালিক সমিতি দায়ী। কারণ ঈদের আগে মালিক সমিতি বলেছিল, তারা ঈদের সময় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করবে না। এখন বাসে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। স্বাভাবিকভাবে চট্টগ্রাম থেকে নওগাঁয় ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়। কিন্তু ঈদের সময় এই ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার। এখন কারো পরিবারে চারজন সদস্য থাকলে একটা সাধারণ পরিবারের পক্ষে আট হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ঈদে বাড়ি যাওয়া সম্ভব না।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানিয়েছেন, ওই লোডেড ট্রাকের ডালা ছিল অনেক উঁচু। ট্রাকের ভেতরে যে মালামাল বা মানুষ আছে তা দেখা যায় না। কাজেই আমাদের সামনে দিয়ে যখন গেছে, তখন আমাদের ফোর্স বা পুলিশ সেটা দেখতে পায়নি। হয়তো যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিল। আর যেহেতু রডভর্তি ছিল, রডটা তো নিচু, উপরে উঠেনি। তাই ওখানে যে লোক ছিল সেটা হাইওয়ে পুলিশ দেখতে পারেনি। বাইরে থেকে দেখা যায় না। অ্যাঙিডেন্ট যখন করছে, তখন বুঝতে পেরেছে লোক ছিল।

নিহতদের মধ্যে নওগাঁর ১০ জন : টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন। সেই গ্রামজুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় থেকে হকারি করতেন। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে তারা বাড়ি ফিরছিলেন।

যাতায়াতের খরচ বাঁচাতে তারা রডবোঝাই ট্রাকটিতে উঠেছিলেন। সেখানে মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের আরো কয়েকজন ছিলেন। ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সাতজনসহ মোট ১০ জন নিহত হয়েছেন। বাকি তিনজন পাকুড়িয়া ও মশিদপুর গ্রামের। নিহতরা হলেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আব্দুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮) মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০), পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)

স্বজনরা বলছেন, নিহত সবাই ফেরিওয়ালা ছিলেন। তারা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। কেউ কেউ নারীদের চুল ও পুরনো মোবাইল ফোন সংগ্রহের কাজও করতেন।

দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে স্বজনেরাও কান্না থামাতে পারছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা বলেন, বাড়ি ফেরার পথে রাতে স্বামীর সঙ্গে তার কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদি কেনার কথাও বলেছিলেন তিনি। মেয়ে অপেক্ষায় ছিল বাবা তার জন্য ঈদের জিনিস নিয়ে আসবে। রাত ১০টার দিকে তার সঙ্গে পরিবারের শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।

মান্দা থানার ওসি খোরশেদ আলম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত সবার পরিচয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার জাহান সাথী বলেন, আমরা নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের খোঁজখবর রাখছি। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিবারের জন্য ২৫ হাজার টাকা ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মরদেহ দাফনসহ নিহতদের পরিবারকে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো এক শিশুর মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধশহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী ৩০ মে