আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবাও ওয়া শাবানা ওয়া বাললিগনা ইলা শাহরি রমাদান। পবিত্র রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। এ মাসে আল্লাহ–তাআলা বান্দাদের প্রতি অসীম দয়া বর্ষণ করেন গুনাহ মাফ করেন এবং জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। কিন্তু এই অফুরন্ত নেয়ামতের পূর্ণ সুফল পেতে হলে দরকার সঠিক প্রস্তুুতি। আল্লাহর রাসুল (সা.) রজব মাসের চাঁদ দেখেই রমজানের জন্য দোয়া শুরু করতেন এবং শাবান মাসে সর্বাধিক নফল রোজা রাখতেন। এ থেকে বোঝা যায় রজব ও শাবান হলো রমজানের আধ্যাত্মিক প্রস্তুুতির সুবর্ণ সুযোগ। রজব মাসের ২৬ তারিখ রাতে আল্লাহতায়ালা রাসূলকে (সা.) মিরাজের মাধ্যমে তার দিদার দিয়েছেন। তাই এ মাস এত মর্যাদাপূর্ণ। রহমতের বারিধারা নিয়ে মুমিনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মাস রমজান। আরবি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস রজব আমাদের মধ্যে হাজির হয়েছে সেই মহিমান্বিত মাসেরই আগমনী বার্তা নিয়ে। পবিত্র ‘রজব’ হলো আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহের মাস। রজব মাস বান্দার গুনাহ মাফের মাস। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–রজব মাসে আকাশ পানে মেরাজে গমন করেছিলেন। ‘রজব’ শব্দের অর্থ সম্মানিত। রজবের ফজিলত সম্পর্কে একটি সুপ্রসিদ্ধ হাদিস হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন রজব মাস শুরু হলে প্রিয় নবী (সা.) এই দোয়া পড়তেন।
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবাও ওয়া শাবানা ওয়া বাললিগনা ইলা শাহরি রমাদান। অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। রজবের প্রথম রাতের দোয়া কবুল হয় পবিত্র হাদিস শরিফে রজবের প্রথম রাতে দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদ এসেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন পাঁচটি রাত এমন আছে যেগুলোতে বান্দার দোয়া আল্লাহতাআলা ফিরিয়ে দেন না অর্থাৎ অবশ্যই কবুল করেন। রাতগুলো হলো জুমার রাত, রজবের প্রথম রাত, শাবানের ১৫ তারিখের রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাত। মুমিন জীবনে মাহে রজবের গুরুত্ব অপরিসীম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন রজব হলো আল্লাহর মাস, শাবান হলো আমার মাস, রমজান হলো আমার উম্মতের মাস। হজরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাস ছাড়া সবচেয়ে বেশি রোজা পালন করতেন শাবান মাসে অত:পর রজব মাসে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) রজব মাসে প্রায় ১০টি রোজা রাখতেন, শাবান মাসে ২০টি রোজা রাখতেন, রমজান মাসে ৩০টি রোজা রাখতেন। হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন রজব ফসল রোপনের মাস, শাবান ফসলে পানি সেচ দেয়ার মাস আর রমজান হলো ফসল তোলার মাস। রজব মাস ঠাসা বাতাসের মতো, শাবান মেঘমালার মতো আর রমজান হলো বৃষ্টির মতো। প্রিয় নবী (সা.) রজব থেকেই মাহে রমজানের প্রস্তুুতি নিতেন। অধিক নফল রোজা ও ইবাদতে কাটাতেন রজব ও শাবান মাসে। তাই আমাদেরও কর্তব্য তার সুন্নাহ অনুসরণ করে রজবের হক আদায় করা। বেশি বেশি নফল নামাজ ও রোজা রাখা।
নবী করিম (সা.) রজব মাসে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে আকাশপথে মিরাজে গমন করেছিলেন। রজব ও শাবান মাসের নেক আমল ও পাপ বর্জনের মাধ্যমে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। মোহমুক্তি ও পাপ পরিহার করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সমাজের একে অন্যকে সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে। রমজান মাসে যেন ইবাদতের পরিবেশ রক্ষা হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। শ্রমিক–কর্মচারীদের কাজের চাপ কমাতে হবে। দান–খয়রাতের পরিমাণ বাড়াতে হবে। রমজানে গরিব মানুষ যেন ভালোভাবে সাহারি ও ইফতার করতে পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে পরিকল্পনা রজব শাবান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। রজব মাসের বরকত ও ফজিলত হাসিল করার জন্য অন্য মাসে পালনীয় ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথ পালন করতে হবে এবং বেশি বেশি নফল ইবাদত করতে হবে। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব ও শাবান মাসে এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। রজব মাসের বরকত ও ফজিলত হাসিল করার জন্য অন্যান্য মাসে পালনীয় ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং নফল ইবাদত বেশি বেশি করতে হবে।
হজরত সালমান ফারসি (রা.) হতে বর্ণিত আছে রজব মাসের প্রথম তারিখে ১০ রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। হজরত উমর (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন অতি মহান চারটি রাত হলো রজব মাসের প্রথম রাত, শাবান মাসের মধ্য দিবসের রাত (শবে বরাত), শাওয়াল মাসের প্রথম রাত (ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদের রাত), জিলহজ মাসের দশম রাত (ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদের রাত)। রজব মাসের বিশেষ আমল সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো–বেশি বেশি নফল রোজা পালন করা। মাস জুড়ে প্রিয় নবি (সা.) এর নিয়মিত আমল : প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা পালন করা। এছাড়া শুক্রবারসহ এমাসেও আইয়ামে বিজের রোজা অর্থাৎ চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ নফল রোজা পালন করা। রোজা রাখার পাশাপাশি এ মাস জুড়ে নফল নামাজ বেশি বেশি আদায় করা। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশ্ত–দোহা, জাওয়াল, আওয়াবিন, তাহিয়াতুল মসজিদ, দুখুলুল মসজিদ ইত্যাদি নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরি। আর সব সময় প্রিয় নবি করিম (স.) এর শেখানো দোয়াটি পড়া আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য। আসুন এই মর্যাদাপূর্ণ মাসটিকে আমরা ইবাদতে মশগুল থেকে আল্লাহতায়ালাকে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি নিজেদেরকেও সওয়াবের অধিকারী করে তুলি। আমরাও যদি মহানবী (সা.) এর সুন্নত অনুযায়ি প্রতি মাসে কয়েকটি করে নফল রোজা রাখি তাহলে রমজানের রোজা আমাদের জন্য আরো সহজ হবে। এছাড়া আমরা যদি মনের সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে রজব মাস থেকেই রমজানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করি তাহলে আমাদের সব ইবাদত বন্দেগী হবে প্রশান্তিময়। রজব মাস ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে (২০২৫ সালের ডিসেম্বরে) এবং আগামী রমজান ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি–মার্চে শুরু হতে যাচ্ছে। এখনই প্রস্তুুতি শুরু করুন। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে রজব ও শাবান মাস জুড়ে এ দোয়াটি বেশি বেশি করে পড়ার এবং আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।











