চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাহমান নাসির উদ্দিনের একটা পোস্ট চোখে পড়লো। তিনি লিখলেন, ‘আমার সাথে যুক্তিতর্ক করেন, গালাগালি কইরেন না। আমার মধ্যে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ও রিচের কাঙালিপনা নাই। ভাইরাল হওয়ার খায়েশ নাই। একাত্তর, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ, ধর্মনিরপেক্ষতা, দল–মত–ধর্ম–বর্ণ–জাত–লিঙ্গ নির্বিশেষে সামাজিক সমতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে কোনো কমপ্রমাইজ নাই। কেউ যদি এসব বিষয়ে অবিশ্বাসী হয়, তার অবিশ্বাসের অধিকারকেও আমি সম্মান করি। আমি ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করি। কেননা আমি বিশ্বাস করি চিন্তার ভিন্নতা সমাজের সুস্থ বিকাশের জন্য জরুরি। ভিন্নমতকে বিবেচনায় নিয়ে নিজের মতকে পরিশুদ্ধ করি।’
বিষয়টি নিয়ে আমিও ভাবি। যে যার মতো রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল থাকার পরও একটা সুস্থির মন থাকা জরুরি। যে–মন একটা বিষয় ধারণ করে, যেটা হলো ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, পরমতসহিষ্ণু হওয়া। অন্যের মতামত সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকাই হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দিক দিয়ে প্রকৃতপক্ষে উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতা এক ও অভিন্ন, একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘মানুষের বাক স্বাধীনতার প্রতি অবহেলা ও অপ্রীতিই সমাজে যত অশান্তির মূল। সব সমস্যার সূত্রপাত সেখানেই। আর পরমতসহিষ্ণুতা যখন লোপ পায়, তখনই মানুষ দানবের মতো আচরণ করতে শুরু করে। ধর্ম, দার্শনিক তত্ত্ব–সবখানেই সহিষ্ণুতা মানবিক গুণাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ও সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণের মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করা হয়। অন্যের কথা, বক্তব্য, মতামত, পরামর্শ ও জীবনাচার যতই বিরক্তিকর ও আপত্তিকর হোক না কেন, তা সহ্য করার মতো ধৈর্য যদি মানুষের মধ্যে না থাকে, তাহলে সমাজে নৈরাজ্য, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে বাধ্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে আধিপত্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জীবনের সব ক্ষেত্রে; সমাজ–সংসার, রাষ্ট্র, দেশ–মহাদেশে, মানবজীবনের প্রতিটি পদে সহিষ্ণুতা শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং আইনের শাসন না থাকা যখন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি অঙ্গে ঢুকে যাবে, তখন তা দেশের বেড়ে ওঠা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও প্রভাব ফেলবে।’
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উঠলেই ফরাসি পণ্ডিত ভলতেয়ারের একটি মন্তব্য বারবার উচ্চারিত হয়– ‘আমি তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তুমি যাতে তোমার মত অবাধে বলতে পারো, তার জন্য আমি নিজের প্রাণ অবধি বিসর্জন দিতে প্রস্তুত’।
আমার একেক সময় মনে হয় যে জাতি হিসেবে আমরা চিন্তাশীল নই, চিন্তাগ্রস্ত। কিন্তু আমাদের চিন্তাগ্রস্ত হলে চলবে না, হতে হবে চিন্তাশীল। চিন্তাচর্চা ব্যতিরেকে কোনো সভ্য জাতি অগ্রসর হতে পারে না। চিন্তাশীলতা বিস্তারের জন্য মুক্তচিন্তা পূর্বশর্ত। মুক্তবুদ্ধির চর্চা যে সমাজে নেই, সেই সমাজ স্থবির হতে বাধ্য। মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতা পরিপূরক। এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের চেতনা। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য মুক্তবুদ্ধি চর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার বিকল্প নেই। পরমত–সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, অন্যের অভিমত ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে দ্বিমত থাকলে যুক্তির ভিত্তিতে তা খণ্ডন করাই হলো মূল্যবোধ। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই গুণগুলো প্রায় অনুপস্থিত।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘এই রাষ্ট্রের যাঁরা শাসক হয়েছেন তাঁরা পরমতসহিষ্ণুতা দেখাননি। চিন্তার স্বাধীনতা দিতে চাননি। আনুগত্য দাবি করেছেন। সৃজনশীলতা পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। মুনাফালিপ্সা ও ভোগের স্পৃহা সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলতে চেয়েছে। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার সংস্কৃতির চর্চায় সামাজিকতার জায়গাতে ব্যক্তিগত উপভোগকে প্রধান করে তুলেছে। অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে তিন ধারার বিস্তারও সমাজ ও সংস্কৃতি উভয়কেই অত্যন্ত ক্ষতিকররূপে বিভক্ত করেছে।’
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে আমরা আশান্বিত হতে পারি না। চারদিকে কেবল উদ্বেগ। এখন বাংলাদেশে শুভময়তার খুবই অভাব, সবখানে অশুভ তৎপরতা। অন্ধকারের রাজত্ব। অপশক্তির আধিপত্য। এখানে ভালো কোনো ঘটনার সংবাদ নেই, আছে দুঃসংবাদ। আমরা যেন ক্রমশ হেঁটে চলেছি অন্ধকারের দিকে। আমাদের সামনে কোনো বাতিঘর নেই, আলোকের ধারায় উদ্ভাসিত করার কোনো শক্তিও নেই। কেবল সংকট আর সংকট। আমাদের শিক্ষা–সংস্কৃতি, জ্ঞান–বিজ্ঞান, শিল্প–সাহিত্য, বিচার–শাসন ব্যবস্থা সর্বোপরি পুরো জাতিসত্তা এখন চলছে উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। সংকটের সাগরে নিমজ্জিত সবাই। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। সর্বক্ষেত্রে চলছে ভয় ও শঙ্কার ছায়া। মুখের জোর থাকলেও বুকের জোর নেই। সব জায়গায় কাজ করতে হচ্ছে ভয়ে ভয়ে।
দেশে যদি সুশাসন অব্যাহত থাকে আর যদি বিরাজ করে সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রবাহ, তাহলে ভেঙে পড়বে না বাংলাদেশের অস্থিমজ্জা। তবে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে আমরা লক্ষ্য করি, বাঙালি কখনো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। আমাদের দেশের মুক্তিকামী গণতান্ত্রিক মানুষকে কখনো ভুল পথে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। বাঙালি মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসকে হত্যা করার ক্ষমতা কারো নেই। বাংলাদেশকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে শান্তিশৃঙ্খলা সুরক্ষায় পরমতসহিষ্ণুতার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, যে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা যতো বেশি, সে সমাজে অপরাধপ্রবণতা ততো কম। এটি গণতন্ত্রের অন্যতম নিয়ামক হিসাবে প্রতিভাত।
২.
স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি ও শৈলী প্রকাশন আয়োজন করছে স্বাধীনতার বই উৎসব। আগামী ২৭ ও ২৮ মার্চ চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠেয় উৎসবে গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, স্বরচিত কবিতা ও ছড়া পাঠ, আবৃত্তি, বইয়ের পৃষ্ঠপোষক সম্মাননা, নতুন বইয়ের প্রদর্শনী। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকছে স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। সকলের অংশগ্রহণে সফল হোক আয়োজন। বইয়ের দিকে মুখ ফেরাতে হবে আমাদের।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;
ফেলো, বাংলা একাডেমি।












