যে-দেশে নিরাপত্তা স্বর্ণমূল্যে বিক্রি হয়

সামিহা খায়ের | শনিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৫ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ছোটবেলায় জুজুর ঘুম পাড়ানি গল্পের কথা মনে আছে? আমাদের দেশে বর্তমানে সে জুজুর ধরন পাল্টেছে অনেকখানি। যে জুজু ছোটবেলায় আমাদের ঘুম পাড়িয়ে দিত, সে যেন নিরীহ একেবারেই। তার জায়গা নিয়েছে একেবারে মানুষের মতো দেখতে কিছু দানব। যাদের কাজ শিশুদের ছোটবেলা কেড়ে নেওয়া।

আর সেই দানবদের আক্রমণে গত ২৫ আগস্ট থেকে খবরের পাতায় উঠে আসছে একই সংবাদ

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মেয়ে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ৩০৬। শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা কি আজ প্রথম শোনা যাচ্ছে? একেবারেই নয়। শিশুরা বিকৃত যৌনতার শিকার হয়ে আসছে বহু বছর থেকেই।

২০১৮ সালের ছয়টি দৈনিক পত্রিকা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায় ৩৫৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হয় ২২ জনের। সংখ্যার এই পরিবর্তন কি আমাদের জানান দেয় দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে? ২০২৫ এর প্রথম সাত মাসের সংখ্যাটি যখন ৩০৬, এক বছর আগেই এ সংখ্যাটি একই সময়ে ছিল ১৭৫। আমাদের দেশে বর্তমানে শিশুদের নিরাপত্তা একেবারেই নেই বললে খুব একটা ভুল হবে না। অথবা এও হতে পারে, ঘটনাগুলো এখন মানুষ বলতে পারছে, আইনের আশ্রয় নিতে পারছে। সামাজিক বিভিন্ন জটিলতার মাঝেও নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানুষের জন্য প্রধান হয়ে উঠছে। তাই ঘটনাগুলো একটু কম ধামাচাপা পড়েছে।

শিশু ধর্ষণের ঘটনায় বাবা মায়ের সচেতনতার অভাব যে একটি অন্যতম কারণ, বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ধরা যাক, মা বাবা হিসেবে আপনি খুবই সচেতন। আপনার সন্তানকে নিজের আত্মীয়ের কাছে রেখে যাচ্ছেন এটা ভেবে যে সে নিরাপদএ ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে পারে। ‘কালের কণ্ঠ’ ২০২৩ সালের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী,পরিবার এবং পরিচিতদের মাধ্যমেই বেশিরভাগ শিশু ধর্ষিত হয়। বিবিসি বলছে, শতকরা ৮৫ ভাগ ধর্ষণের সাথে জড়িত পরিচিত মানুষরা।

শুধুমাত্র আত্মীয় নয, বাবা, মা, ভাইধর্ষকের তালিকা থেকে আর কোন সম্পর্কই যেন বাদ পড়ছে না। ‘আমাদের সময়’ পত্রিকার ২০২৩ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, টানা এক বছর নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করে গেছে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়নের খোরশেদ আলম। তার এই কাজে সহযোগিতা করেছে ভুক্তভোগীর দাদি, ধর্ষকের মা মঞ্জুয়ারা বেগম। পরবর্তীতে মেয়েটির মা জানতে পেরে থানায় মামলা করেন এবং পুলিশ তাকে আটক করে। এধরনের ঘটনা এক দুটোর চেয়ে অনেক বেশি। আমরা মানুষ হিসেবে চেষ্টা করি যেকোন অস্বাভাবিক ঘটনা যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতে, এবং বারবার এড়িয়েও যাচ্ছি। এতে আদৌ কি কোন লাভ হচ্ছে বা হয়? ঘটনাগুলো কি থেমে থাকছে? যে সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আমরা ঘটনাগুলো না দেখার ভান করি, সত্যিই কি সে সমাজের অবক্ষয় রোধ করা গেছে? একটি সমাজের ভবিষ্যৎ মূলত শিশুরা। সেই শিশুদেরই নিরাপত্তা দিতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা।

বাংলাদেশের শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বারবার মেয়ে শিশুদের কথা উঠে আসলেও ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন যেন হয়ে উঠছে একেবারেই সাধারণ ঘটনা। মাদ্রাসার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিশুরা আর নিরাপদ নয়। যা হওয়ার কথা ছিল নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের এক নিরাপদ পরিবেশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২১ এর তথ্যমতে, ৬২ জন ছেলে শিশু মাদ্রাসায় ধর্ষণের শিকার, মৃতের সংখ্যা ৩। এ সংখ্যা শুধুমাত্র পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অথবা ঠিক আমাদের চোখের সামনেই, পাশের বাসা হোক অথবা স্কুল, মাদ্রাসায়কতশত ঘটনা মাটিচাপা দেওয়া হয় প্রতিদিন, সে সংখ্যার হিসাব রাখার আমাদের যে দায়হীনতা, সম্ভবত এর কারণেই আমাদের দেশের শিশুদের এই করুণ পরিস্থিতি।

ধর্ষণ একটি বিকৃত যৌন চাহিদা, শিশু ধর্ষণ সম্ভবত আরো দুই গুণ বেশি বিকৃত যৌন চাহিদা। চাহিদা শব্দটিও সঠিক কিনা আমার জানা নেই। এর চেয়ে বরং বিকৃত যৌন আকঙ্ক্ষা বলা উচিত। এটি কোন চাহিদা নয় যা পূরণ করতে হয়। এটি বিকৃত মস্তিষ্কের তৈরি করা আকঙ্ক্ষা, যা সুস্থ মানুষ কখনো চিন্তাও করতে পারবে না। তাহলে এই অসুস্থ চিন্তা আসছে কোত্থেকে? কেন এসব মানুষ শিশুদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

এর জন্য একটা বড় অংশ হিসেবে দায়ী করা হয় পর্নোগ্রাফিকে। ডয়েচে ভেলের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রোগ্রামের কোঅর্ডিনেটর আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, দেশে পর্নোগ্রাফির ভোক্তা কারা এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন জরিপ নেই। তবে ৩০ থেকে ৩৫ বছরের পুরুষরা শতভাগ জীবনে কখনও না কখনও পর্নোগ্রাফি দেখেছেন, নিয়মিত দেখেন ৯০ ভাগ। নারীদের বেলায় তা ৫০ শতাংশ বলে তিনি জানান।

পর্ণোগ্রাফিকে দায়ী করার কারণ হলো, এটি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে, যৌন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। “চাইল্ড পর্ন” অর্থাৎ শিশুদেরকে পর্নোগ্রাফিতে যুক্ত করা এবং এর সহজলভ্যতাও শিশু ধর্ষণ বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়। তবুও একমাত্র পর্নোগ্রাফি কে দায়ী করার ব্যাপারে অনেকের দ্বিমত রয়েছে। ধর্ষকরা সাধারণত এমন কাউকেই তাদের অপরাধের জন্য বেছে নেয় যে তুলনামূলক শারীরিক ও মানসিকভাবে তার থেকে দুর্বল। শিশুরা সে কারণে তাদের সবচে সহজ শিকার। যেহেতু অনেক সময়ই এ ধরনের ঘটনাগুলো পরিচিতদের হাতে হয়, তাই শিশুদের ভয়ভীতি অথবা কোনকিছুর লোভ দেখিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা আরো খানিকটা সহজ। বাবা মা তাদের সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজেদের শিশুদের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা উঁচু করতে চাইবেন না, এ ধারণাও একজন ধর্ষককে সুযোগ করে দেয় তার অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করতে। অর্থাৎ সামাজিক ভাবে ভুক্তভোগীকে যে ধরনের লজ্জা বা ভিক্টিম ব্লেমিংয়ের মাঝ দিয়ে যেতে হয়তা অপরাধীকে মাথা উঁচু করে বাঁচার সাহস তৈরি করে দেয়।

শিশু অবস্থায় ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার হতে হলে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ কি ভয়ঙ্করভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, সেটা বুঝার ক্ষমতা সম্ভবত আমাদের হয়নি। শারীরিক বিভিন্ন জটিলতার পাশাপাশি একটি দীর্ঘ সময় তারা মানসিক বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে থাকে। যে তীব্র ঘৃণা এবং ভয়ের উৎপত্তি তাদের মাঝে হয়, সেগুলো এমনকি আমৃত্যু তাদের বয়ে বেড়াতে হতে পারে। শুধু এটাই নয়, শিশু অবস্থায় যারা নির্যাতিত হয়, তাদের মাঝে অনেকেরই বিষয়টিকে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। যেহেতু শিশু অবস্থায় সে একটি প্রতিকূল পরিবেশে বড় হয়েছে এবং সেও একসময় ভুক্তভোগী ছিলফলে তার নিজের মাঝেও একজন অপরাধী তৈরি হতে পারে। তাই এসকল শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

সুবিচার পাওয়ার আশা করতে চাইলে, প্রথমত আমাদের ভিক্টিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার প্রবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট, কমেন্ট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা কোনো না কোনোভাবে অপরাধীর অপরাধকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। একটি শিশুর ক্ষেত্রেও তার পোশাককে কারণ হিসেবে বর্ণনা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ বাল্যবিবাহকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এর বড় একটি কারণ হতে পারে “কনসেন্ট বা সম্মতি” শব্দটির ধারণা সম্পর্কে অবগত না থাকা। কনসেন্ট এর ধারণা শিশুদেরকেও শেখাতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদেরকে “না” বলতে শেখানো, নিজের অনুভূতিকে প্রাধান্য দেওয়া, অন্যদের অনুভূতিকে সম্মান প্রদর্শন করে কিভাবে নিজের কথা তুলে ধরতে হয়এসব বিষয় আমাদের অবশ্যই শিশুদের মনে গেঁথে দিতে হবে। অথচ এদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝেই শব্দটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জানার বা বুঝার কোন আগ্রহও নেই।

আমাদের কি আছিয়ার কথা মনে পড়ে? বাল্য বিবাহ হওয়া বোনের স্বামীর হাতে ধর্ষিত হওয়া মেয়েটি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেনি। আমাদের সমাজের মাঝে বেঁচে থাকলেও হয়ত সে টিকে থাকতে পারত না। আমরা এরকম ঘৃণিত অপরাধের জন্য কিভাবে যেন আমাদের শিশুকেই শেষ পর্যন্ত দায়ী করে ফেলি। আগেও বলেছি, এই সুযোগটিই মূলত বারবার অপরাধীরা নিতে থাকে। কারণ ওরা জানে এ সমাজের মানুষ যতোটা আঙুল তার দিকে উঠাবে, তারচেয়ে বেশি আঙুল উঠাবে ভুক্তভোগীর দিকে। কিন্তু এ ধারণা পাল্টে দেবার সময় এসেছে। আমাদের শিশুদের আঘাত করা প্রতিটি আঙুল ভেঙে দিতে হবে আমাদেরই। শিশুদেরকে অবশ্যই নিজেদের বাউন্ডারি তৈরি করা শেখাতে হবে। যেন “যে কেউই তাদের শরীরে স্পর্শ করতে পারবে না, এটি একটি অপরাধ”এ ধারণাটি তাদের মাঝে তৈরি হয়। এবং পাঠ্যবইয়ে কনসেন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াতে হবে। মানুষের মাঝে সম্মানের সম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে কাউকে শুধুমাত্র একটা বস্তু হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখার অভ্যাসটুকু ছোটবেলা থেকেই গড়ে উঠবে। মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান সম্পর্কেও তারা অবগত হবে। শিশুরা যেন নিজ বাড়িতে নিরাপদ বোধ করে এবং সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একজন শিশুকে এ সুযোগ করে দেওয়ার প্রথম দায়িত্বটি বাবা মায়ের। এরপরেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের। রাষ্ট্রকে তার ভবিষ্যত নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু নিলেই চলবে না, এর পালনও করতে হবে।

আমাদের দেশের শিশুরা বেড়ে উঠুক আনন্দে, নিরাপদে, সুস্থ পরিবেশে এবং সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবে। শিশুদের ঘিরে এই নাশকতার অবসান হোক শীঘ্রই। জুজু হোক বা দানব, ভয়হীন পৃথিবীতে তারা মুক্ত আকাশের পাখি হয়ে উড়ে বেড়াক বহুদূরে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশুধু মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করলে হবে না, তাদের দেশে ধরে রাখতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের ঐতিহ্য মধুভাত: নেপথ্য কারিগর কিন্তু নারীরা