দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেছেন, যে মানুষ শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলে, যার বাচনভঙ্গী সুন্দর– সে মানুষ সহজেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
গতকাল নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট (টিআইসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গন এর ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম এ মালেক এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দেশবরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী, গবেষক ও প্রশিক্ষক নাসিম আহমেদ, ঢাকার লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শায়লা আহমেদ, বিশিষ্ট নাট্যজন ও সংগঠক আহমদ নাসিমুল হুদা নওশাদ এবং বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ও কবি মহিউদ্দিন তাহের। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গন এর সভাপতি, প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা ও প্রধান প্রশিক্ষক মোসতাক খন্দকার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ক্বণন এর কার্যকরী পরিষদ সদস্য আবৃত্তিশিল্পী ও লেখক সৌভিক চৌধুরী।
এম এ মালেক বলেন, ভালো কাজ করার একমাত্র উপায় হলো– আপনি যা করছেন তা ভালোবাসতে পারা। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের ভালো লাগার জায়গাটি খুঁজে বের করা উচিত। কারণ, আপনি যেখানে আপনার হৃদয় প্রাণ ঢেলে দিয়ে কাজ করতে পারবেন, সেখানেই আপনার শ্রেষ্ঠ কাজটির জন্ম হবে। মোসতাক খন্দকার এটা পেরেছেন। পেরেছেন বলেই, তার তত্ত্বাবধানে ক্বণন নামে যে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি– তা আজ সাফল্যের সাথে ৪০ বছর পূর্ণ করেছে। এটা এক বিশাল অর্জন। তিনি বলেন, আমি যেখানেই যাই একটা কথা বলি– যে কাজ করি না কেন সেখানে লেগে থাকতে হবে। এতে সাফল্য আসবে। শুধু নিজে পাওয়ার আশায় কিছু করলে পরিশেষে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। তাই কাজ করতে হবে মানুষের সেবার উদ্দেশে। মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রচেষ্টায় থাকতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে আলোকিত করার প্রত্যয়। ক্বণনের সাফল্য আমাদের সামনে এই সত্যই তুলে ধরে– সত্যিকারের সফল হওয়ার একমাত্র উপায় হলো অন্যদের সফল হতে সাহায্য করা।
তিনি আরো বলেন, আপনারা যারা সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত– আপনাদের সাহচর্য আমার ভালো লাগে। আমি বিশ্বাস করি– সংস্কৃতি বাঁচে মানুষের চর্চায়, আর সংগঠন সেই চর্চার ঘর। ক্বণন শব্দটিও আমার কাছে শ্রুতিমধুর মনে হয়। এর অর্থ – ধ্বনি, ঝংকার, অনুরণন। কিন্তু এই সব অর্থ ছাপিয়ে ‘ক্বণন’ আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে– বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণের চর্চা কেন্দ্র, শব্দের মাধ্যমে মানুষের মনে আলো জ্বালানোর এক নিরলস প্রচেষ্টার নাম। ‘ক্বণন’ শেখায় শব্দকে সম্মান করতে। ‘ক্বণন’ শেখায় ভাষাকে ভালোবাসতে, আর আবৃত্তিকে শিল্প হিসেবে ধারণ করতে। এখানে শিক্ষার্থী ও শিল্পী একসঙ্গে চর্চা করে শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এম এ মালেক বলেন, আবৃত্তির কথা আসলে কবিতার প্রসঙ্গও আসে। বলা হয়– আবৃত্তিতে কবিতা প্রাণ পায়। Recitation gives life to words. সত্যি বলতে কী– এখন অনেক কবিতা–ই বুঝতে পারি না। দুর্বোধ্য লাগে। যে কবিতা বুঝতে পারি না, অনেক ক্ষেত্রে তার আবৃত্তি শুনলে অন্য একটা অনুভূতি জন্মায়। ভালো লাগে। সে–ই কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এখানেই একজন আবৃত্তি শিল্পীর সার্থকতা। তিনি শ্রোতাকে বুঝিয়ে দেন– তিনি কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি কণ্ঠ দিয়ে কবিতার ছবি আঁকেন। শ্রোতা অনুভব করে, সে প্রতিটি লাইনে প্রাণ খুঁজে পায়। ক্বণনের সাফল্য এখানে যে– ৪০ বছরের পথ পরিক্রমায় তারা এ রকম বহু শিল্পী সৃষ্টি করতে পেরেছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নাসিম আহমেদ বলেন, ক্বণন এর সাথে বহু বছর ধরে আমার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্বণন এর নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। নিরলসভাবে কাজ করার ফলেই এটি হয়েছে। এভাবেই এগিয়ে যাক ক্বণন। আরো বহু বছর ক্বণন তার কাজের মাধ্যমে এ অঞ্চলে টিকে থাকবে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যান্য বক্তারা বলেন, ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গন চট্টগ্রামে আবৃত্তি শিল্পের একটি পথিকৃৎ সংগঠন। দেশের আবৃত্তি ভুবনের একটি নন্দিত নাম। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারী কৃণন’র প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার ও সভাপতি, আবৃত্তি শিল্পের শিক্ষক মোসতাক খন্দকারের একান্ত নিজস্ব উদ্যোগে ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গনের সাংগঠনিক যাত্রা শুরু হয়। শুদ্ধ শিল্পের জন্য শুদ্ধতম প্রচেষ্টা এ বিশ্বাসের প্রায়োগিক চর্চায় নিবেদিত ক্বণন’র নিরলস পথচলা। আবৃত্তি শিল্পের বিকাশে এবং জনগ্রাহ্যতা সৃষ্টিতে ক্বণন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বক্তারা আরো বলেন, ধ্বনি সমষ্টির শুদ্ধ ও শিল্পীত উচ্চারণই আবৃত্তি। কবিতার অন্তর্গত সুর ও পংক্তিমালাকে বাচিক রূপ দেয়াই হচ্ছে আবৃত্তি। কবিতার ধ্বনিরূপকে বাচনিক নান্দনিকতায় শ্রোতার মনোজগতে উপলব্ধির স্তরে উত্তীর্ণ করে দেয়াই আবৃত্তি। আবৃত্তি গানের মত, নাটকের মত নিজস্ব অবয়বের শিল্প মাধ্যম। গান যেমন সুরাশ্রয়ী হয়ে বাণীকে তুলে ধরে, নাটক যেমন অভিনয় গুণে চরিত্রকে বাস্তবানুগ করে ফুটিয়ে তোলে, তেমনি আবৃত্তিকার আবৃত্তি গুণে শ্রোতাদের কবির কল্পনাশ্রয়ী জগতে পৌঁছে দেয়।
সভাপতির বক্তব্যে মোসতাক খন্দকার বলেন, ক্বণন পরিবারের আবৃত্তিশিল্পী, শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রামে আবৃত্তিচর্চার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আজকের এই দিনটি একটি স্মরণীয় দিন। ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গন জানায়, ক্বণন শুদ্ধতম আবৃত্তি অঙ্গন এর ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নগরীর চেরাগি পাহাড় থেকে টিআইসি মিলনায়তনে শোভাযাত্রা, এরপর বিকাল ৪ টায় টিআইসি চত্বরে বেলুন উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, বিকাল সাড়ে ৪ টায় প্রীতি আড্ডা ও অতিথি আপ্যায়ন এবং মাগরিবের নামাজের পর আলোচনা ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।











