ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ধারাবাহিক বোমা হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। তার মানে এ যুদ্ধ কোন দুর্ঘটনা নয়, এ পর্যন্ত কেউ জানে না এর শেষ কীভাবে হবে। যুদ্ধ মানে ধ্বংস। এ পর্যন্ত ইরানে নারী–শিশুসহ এক হাজরের বেশি বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। অথচ যুদ্ধের অন্যতম কারণ ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির– উৎস তিনটি স্থানে (ইসফাহান, পারচিন বা নাতাঞ্জের) পারমাণবিক স্থাপনাগুলির ওপর কোনও হামলা করা হয়নি।
বিশ্ব হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো–২৮শে ফেব্রুয়ারি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে একযোগে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রথমে ইরানের শাসকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতকিছুর ধ্বংসের পরও এটা অসম্ভবভাবে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড কর্তৃক প্রকাশিত লক্ষ্য তালিকা থেকে একটি সম্পদ অদ্ভুতভাবে অনুপস্থিত রয়েছে; তাহলো– ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতার উৎস স্থল। প্রশ্ন উঠেছে কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এ তিনটি স্থানকে বাদ দিলো। এ লেখার সময় পর্যন্ত –ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলি – অন্তত গত জুনে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়নি, আশ্চয্যজনকভাবে সামপ্রতিক মার্কিন এবং ইসরায়েলি সামরিক সাফল্যের কোনও বর্ণনায় স্থান পায়নি। প্রতিরক্ষা তাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লোজউইটজ লিখেছিলেন– প্রতিটি যুগের নিজস্ব ধরনের যুদ্ধ ছিল, নিজস্ব সীমাবদ্ধ পরিস্থিতি ছিল এবং নিজস্ব অদ্ভুত পূর্ব ধারণা ছিল। তবুও সময়ের যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা আশ্চর্যজনকভাবে কঠিন; অতীতের দিকে তাকালেই তা করা সহজ হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে কী ধরণের যুদ্ধ হতে পারে তা ভবিষ্যদ্বাণী করা আরও কঠিন। যখন যুদ্ধ পরিবর্তিত হয়, তখন এটি যে নতুন রূপ নেয় তা প্রায় অবাক করে দেয়। এতে কৌশলগত পরিকল্পনাকারীরা একটি মোটামুটি স্থির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
সমপ্রতি প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ২ মার্চ বলেন– ‘এ অভিযান একটি স্পষ্ট, ধ্বংসাত্মক, সিদ্ধান্তমূলক মিশন: ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি ধ্বংস করা, নৌবাহিনী ধ্বংস করা, কোন পারমাণবিক অস্ত্র নেই।’ মূলত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতির অগ্রাধিকার। অতএব, এটা অবাক করার মতো যে মার্কিন অভিযানগুলি, এখনও পর্যন্ত, এটি প্রতিফলিত হয়নি। ইরান এখনও একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংরক্ষণ করেছে এবং সেই উপকরণগুলিকে অস্ত্রের উপাদানে রূপান্তর করার ক্ষমতাও তাদের থাকতে পারে। শুধু বিমান হামলায় এটি রোধ করতে পারবে এমনটা অসম্ভব। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে অক্ষম। এটি অর্জনের জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি বিকল্প বেছে নেওয়ার আছে – একটি চুক্তি বাতিল করা অথবা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে বাধ্য করা – উভয়ই অপ্রীতিকর এবং বিশাল ঝুঁকি বহন করে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে –৭ অক্টোবর, ২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের ২০২৫ সালের জুনে অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের কারণে ইরান – এ অঞ্চলের প্রধান অস্থিতিশীল শক্তি হলেও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অথচ অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের উপর ইরান দাঁড়িয়ে রয়েছে। একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এখনো ইরানের কাছে রয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরান সরকার কর্তৃক গণবিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার পরই আবারও আলোচনায় ফিরে আসে ট্টাম্প। ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দৃশ্যত তার হুমকি কাজে লাগানোর জন্য। কিন্তু পথে মিশনের ধরণ বদলে গেল, ট্রাম্প আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে ফিরে এলেন। ট্টাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন যে তেহরানের উচিত অবিলম্বে তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়া, অন্যথায় তিনি বল প্রয়োগ করবেন। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ট্টাম্প আলোচনায় সম্মত হন যা তত্ত্বগতভাবে পারমাণবিক সমস্যার একটি নতুন সমাধান খুঁজে পেত। ২৬ ফেব্রুয়ারি আলোচনাটি আরও কারিগরি আলোচনার জন্য একটি ধারণাগত চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়। মাত্র দুই দিন পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়ে। ২০০৩ সালে, ইরানের সর্বোচ্চ ধমীয় নেতা খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে হত্যা করা হলো। অপরদিকে ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানে আক্রমণ করা ‘অসম্ভব’ হবে। এ দ্বিচারিতার দোলাচালে পশ্চিমা সমালোচকরা বলছেন– মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত ‘চিরকালের যুদ্ধ’ না করার প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন। বাস্তবে বিপরীতটি সত্য। ট্রাম্প ইরানে চিরকালের যুদ্ধ শুরু করছেন না; তিনি একটি যুদ্ধের অবসান চাচ্ছেন। এ প্রশ্নের উত্তরে ট্টাম্পের পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে বলে সমপ্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয় কলামে তুলে ধরা হয়েছে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক।












