যুদ্ধের এক মাসের মাথায় নতুন মোড়, এবার রণাঙ্গনে হুতিরা

হরমুজ প্রণালির পর হুমকির মুখে পড়তে পারে সুয়েজ খালও তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১, আহত বহু

আজাদী ডেস্ক | রবিবার , ২৯ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইরানে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। আমেরিকাও যোগ দেয় সেই সংঘাতে। তবে তাদের হামলায় দমে যায়নি ইরান। পাল্টা হামলা শুরু করে তারা। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। এক মাস কেটে গিয়েছে। হুঁশিয়ারি, পাল্টা হুঁশিয়ারিসব মিলিয়ে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া। এক মাস পরে প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘পরিকল্পনা’ কি সফল? না কি ইরানের চাপে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন তিনি? অনেকের মতে, ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের হত্যা করে সরকার ফেলে দিতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব ছবি অনেকটাই ভিন্ন। এই পর্যায়ে অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের আস্ফালনই সার। ইরানকে বাগে আনতে ব্যর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকা এবং ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত ‘অবরুদ্ধ’ করে রেখেছে ইরান। তার ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে জ্বালানি সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল এবং গ্যাসের বড় অংশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। ইরানের ‘অবরোধের’ কারণে অনেক দেশের জাহাজই আটকে রয়েছে ওই প্রণালীতে। ট্রাম্প বার বার দাবি করেছেন, যে ভাবেই হোক হরমুজ ইরানের বাধামুক্ত হবে! এমনকি মার্কিন নৌবাহিনী পাঠিয়ে জাহাজ পাহারা দিয়ে পারাপারের কথাও বলেন ট্রাম্প। কিন্তু কয়েকটি দেশ ছাড়া আর কারও জাহাজ হরমুজ পার করতে দিচ্ছে না ইরান। বর্তমানে এই সরু জলপথের আশেপাশে প্রায় ২,০০০ জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যা ইরানের উত্তর পাশে এবং ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ পাশের মাঝে অবস্থিত।

এদিকে এক মাস পরে এসে এ যুদ্ধ এখন নতুন মোড় নিয়েছে। প্রথমবার ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইয়েমেনের হুতিরা। গতকাল তারা জানায়, দখলকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণে অবস্থিত সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইরান যুদ্ধে তাদের সম্পৃক্ততা বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘গত আড়াই বছরে আমরা দেখেছি, হুতিদের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। তারা যদি বাব আলমানদেব প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে লোহিত সাগর এবং শেষ পর্যন্ত সুয়েজ খালে প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খাল এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথই বাধাগ্রস্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘এগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথ। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতির প্রভাব হবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।’

গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বছর দুয়েক আগে হুতিরা লোহিত সাগরে পশ্চিমা দেশের জাহাজে হামলা চালায়, সেখানে চারটি জাহাজ ডুবেছে। শতকোটি ডলারের বেশি অস্ত্রশস্ত্র খরচ হয়েছে লোহিত সাগরকে নিরাপদ করতে, তারপরও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ওই জলপথ এড়িয়ে চলে। এই নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে চলমান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার মধ্যে ইরান ও তার মিত্রদের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে। আল জাজিরা লিখেছে, ইসরায়েলে হুতিদের হামলাকে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে দেখতে পারে।

অপর এক খবরে বলা হয়, ইসরায়েলের তেল আবিব এলাকায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত একজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির ওয়ারহেডে ক্লাস্টার বোমা থাকায় সেটি বিস্তৃত একটি এলাকাজুড়ে আঘাত হেনেছে আর তাতে আরও অনেকে আহত হয়েছে। শুক্রবার স্থানীয় সময় রাতে চালানো এ হামলাটি সেদিনের ষষ্ঠতম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল জানিয়েছেন টাইমস অব ইসরায়েল। এয়ার ডিফেন্স ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। উদ্ধারকারী বাহিনীগুলো জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটির আঘাতে প্রায় ১৫০ মিটার ব্যাসার্ধের একটি এলাকার মধ্যে থাকা ভবন, ঘরবাড়ি ও পার্কিং লট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক মাসের যুদ্ধে ইরান ইসরায়েল লক্ষ্য করে ৪৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে আইডিএফ জানিয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৯২ শতাংশ বাধা দিয়ে ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েলের এয়ার ডিফেন্স।

দুবাইয়ে ইরানের হামলায় পাঁচ শতাধিক মার্কিন সেনা হতাহত: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ইরানের পাল্টা হামলায় পাঁচ শতাধিক মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের এক মাসের মাথায় এ দাবি করলো তারা। গতকাল শনিবার ইরানের খাতাম আলআনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে এমনটি দাবি করেছেন, জানিয়েছে দেশটির আধাস্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা তাসনিম। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় তাদের দুটি গোপন আস্তানা শনাক্ত করা হয়েছে। দুবাইয়ের প্রথম আস্তানায় ৪০০ জনের বেশি এবং দ্বিতীয় আস্তানায় ১০০ জনের বেশি সেনা অবস্থান করছিল। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্স এবং নৌবাহিনীর নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুটি আস্তানাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তাদের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’ মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, হামলার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মৃত এবং আহত মার্কিন কমান্ডার ও সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলেছে।

এদিকে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের সামরিক হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। খবর বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমোসাদ ভেবেছিল ইরানে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাবে, পারেনি
পরবর্তী নিবন্ধসংসদে শব্দযন্ত্রের বিভ্রাট অন্তর্ঘাত কি না, তদন্তে কমিটি