ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত ক্রমেই তীব্র আকার নিচ্ছে। একদিকে ইরানে ব্যাপক হামলা, অন্যদিকে তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে ইরান কঠোর অবস্থানের কথা জানাচ্ছে। পাল্টা হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি নেতৃত্ব। একই সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ফোনালাপ এবং পুতিনের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আলাপও এ সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে নিহত মানুষের সংখ্যা এক হাজার ৩৩২ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বলেন, নিহতদের মধ্যে ২০৬ জন নারী ও শিশু রয়েছে। তিনি আরও জানান, হামলায় ১১ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় স্বাস্থ্যসেবার অন্তত ৫২টি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৯টি চিকিৎসা স্থাপনা, ১৯টি জরুরি চিকিৎসা ইউনিট এবং ১৬টি অ্যাম্বুলেন্স। চারটি অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি উদ্ধারকারী নৌযান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
ইরান সরকার আরও দাবি করেছে, মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ১৯৩ শিশু নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শিশুর বয়স মাত্র আট মাস। ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ লিখেছে, ইরানের কেন্দ্রীয় শহর খোমেনের একটি বিদ্যালয়ে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাফেজ খোমেনি বিদ্যালয় এবং আশাপাশের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলার মধ্যে নতুন স্কুল হওয়ার হওয়ার খবর এল।
অন্যদিকে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই হাজার ৩৩৯ জন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯৫ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যাদের অবস্থা গুরুতর থেকে মাঝারি পর্যায়ের। লেবাননেও ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৮৬ জন নিহত এবং এক হাজার ৩১৩ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা সর্বশেষ দফায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ৩৪তম দফার এই হামলায় ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির কাছে আল–ধাফরা বিমানঘাঁটি, বাহরাইনের জুফায়ার ঘাঁটি, ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি এবং হাইফার বেসামরিক বিমানবন্দর।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, ইরান থেকে তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর পাওয়া গেছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। লেবানন থেকেও ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়া হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বেশিরভাগ রকেট প্রতিহত করা হলেও দুটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে, যাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এদিকে কাতারের রাজধানী দোহায় কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও দাবি করেছে, তারা নয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫টি ড্রোন শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৬টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। ইরানে নতুন করে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার অভিযোগও উঠেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় শহর খোমেনের একটি বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। হাফেজ খোমেনি বিদ্যালয় ও আশপাশের ভবন এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় চারজন ইরানি কূটনীতিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তেহরান। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে লেবানন থেকে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সিরিয়ায় পালিয়ে গেছে।
চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতির পক্ষে নয়। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে লিখেছেন, আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। কারণ আমরা মনে করি আগ্রাসনকারীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে যাতে সে শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আমাদের প্রিয় ইরানে হামলার কথা না ভাবতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। এক পোস্টে তিনি বলেন, যে ইরানকে ধ্বংস করার ভ্রম পোষণ করে, তিনি ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আগ্রাসনকারীরা এসেছে এবং চলে গেছে; ইরান টিকে আছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, প্রথম পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন তারা অন্য পরিকল্পনা কার্যকর করার চেষ্টা করছে। রেভল্যুশনারি গার্ডসও বলেছে, যুদ্ধের সমাপ্তি যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানই নির্ধারণ করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আগের চেয়ে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী হামলা চালাবে। ট্রাম্প বলেন, আমরা এমন লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করব যেগুলো সহজেই ধ্বংস করা সম্ভব, যাতে ইরানের পক্ষে আর কখনো একটি জাতি হিসেবে পুনর্গঠিত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ক্ষতি করেছে।
গতকাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে আজ হবে ‘সবচেয়ে তীব্রতম’। তার ভাষায়, ওই দিনে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের শাসনব্যবস্থাকে কার্যত গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, এই আলোচনায় ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং পুতিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। পুতিন একই সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান এবং দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক নজরদারি জোরদার করতে ‘ই–৭এ ওয়েজটেইল’ নজরদারি বিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। সংঘাতের ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন উৎপাদন কারখানা এবং সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির কোনো সম্ভাবনা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে পড়ছে এবং এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে দর বৃদ্ধি ও পতন দেখা দিয়েছে। অপরিশোধিত তেল বর্তমানে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছে, যা গত সোমবারের ১১৯ ডলারের স্তরের তুলনায় অনেকটা নিচে। গত ২৪ ঘণ্টায় দাম কমলেও, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় তেলের দাম এখনো অনেক বেশি; তখন প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার।
গতকাল ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দাম মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু তেল–সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কিছু দেশের ওপর আমাদের নিষেধাজ্ঞা আছে। পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব। তারপর, কে জানে? হয়তো আর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে না, এতটাই শান্তি থাকবে।











