যুক্তরাষ্ট্র–ইরান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আয়োজক হিসেবে রয়েছেন পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা। তারা এই আলোচনা ঘিরে আশার আলো দেখছেন আর জোর দিয়ে বলছেন, অন্য অনেক দেশের তুলনায় উভয় পক্ষের প্রতিই তাদের আস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, তিনিও আশাবাদী সুরেই কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয় এখানে তুলে ধরা হল–
লেবানন ইস্যু : একদিকে ইরানে যখন যুদ্ধবিরতি চলছে, অন্যদিকে তখন লেবাননের হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান চলমান রয়েছে। যে কারণে আলোচনার শুরুতেই তা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এঙ একাউন্টে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধবিরতির আলোচনাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, আমাদের আঙুল এখনো ট্রিগারেই রয়েছে। ইরান কখনোই তাদের লেবাননের ভাই–বোনদের ছেড়ে যাবে না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হেজবুল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। তবে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে ইসরায়েলের বারবার সতর্কবার্তার পরও অবশ্য সেখানে নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এখন কিছুটা কম হবে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হবে। তবে সেটি কি ইরানকে খুশি করতে নামকাওয়াস্তে আলোচনা হবে কি–না সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
হরমুজ প্রণালি : ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় শুরুতেই যে বিষয়টি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে তার একটি হরমুজ প্রণালি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান শুরুতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা বললেও এখন খুবই নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, আমাদের সাথে এমন চুক্তি ছিল না। ইরান ওয়াদার বরখেলাপ বরখেলাপ করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বর্তমানে খুব অল্প সংখ্যক জাহাজই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে। শত শত জাহাজ এবং আনুমানিক ২০ হাজার নাবিক এখনো পারস্য উপসাগরের আটকা পড়ে আছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর ইরান এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেই মনে হচ্ছে।
তারা এই প্রণালীকে নিজেদের সার্বভৌম জলসীমা বলে দাবি করছে এবং কোন জাহাজ চলতে পারবে আর কোনটি পারবে না, তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এর জন্য নতুন নিয়মও তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার ইরান জানিয়েছে, বিদ্যমান আলাদা দুটি ট্রাফিক চ্যানেলের উত্তরে নতুন আরেকটি ট্রানজিট রুট চালু করা হচ্ছে। তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালির নৌপথে বিভিন্ন ধরনের জাহাজবিধ্বংসী মাইনের উপস্থিতি এড়াতেই নতুন এই রুট জরুরি ছিল।
সম্প্রতি এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ পার হতে পেরেছে তাদের মধ্যে কিছু জাহাজকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত টোল পরিশোধ করতে হয়েছে। এমন খবরের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, কোনো জাহাজ থেকে ইরানের ফি নেওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো।
পরমাণু শক্তি : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ ও অমীমাংসিত ইস্যু হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু করেছিলেনই মূলত ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করতে না পারে সে জন্য। ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর বেশিরভাগই এই দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখে। তবে ইরান জোর দিয়েই বলছে যে, পারমাণবিক অস্ত্র নয়, এনপিটি স্বাক্ষরকারী হিসেবে শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার বিষয়টিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। যদিও এর মধ্যেই রয়েছে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিটি। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছে যে ইরানকে নিজস্ব ভূখণ্ডে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র বা তা অর্জনের সক্ষমতা পাবে না।
এই জটিল ইস্যু সমাধানে আন্তর্জাতিকভাবে নানা আলোচনাও হয়েছে। ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বা জেসিপিওএ পর্যন্ত পৌঁছাতে বহু বছর লেগেছিল। যেখানে এই ইস্যুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং সমাধানেরও চেষ্টা করা হয়। এমন অবস্থায়– আবারো কী এই ইস্যুটি নিয়ে নতুন করে দুই দেশ আলোচনায় প্রস্তুত কি না সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা : ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অন্যতম হলো লেবাননের হেজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, গাজার হামাস এবং ইরাকে বিভিন্ন মিলিশিয়া বাহিনী। যে গোষ্ঠীগুলো তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে সহযোগিতা করছে। এর মাধ্যমে ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনও চলছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের এই মিত্র শক্তিগুলোও (অ্যাঙিস অব রেজিস্ট্যান্স) ধারাবাহিক হামলার মুখে রয়েছে। ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদও আগেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল ইরানের এই মিত্র শক্তিগুলোকে ‘অ্যাঙিস অব ইভিল’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তার জন্য এই গোষ্ঠীগুলো হুমকি হিসেবে দেখে এবং এগুলোকে নির্মূল করা জরুরি বলেও মনে করে।
এদিকে ইরানের অর্থনীতি যখনই চাপে পড়েছে, তখন অনেক ইরানি নাগরিকই চেয়েছেন তাদের সরকার দেশের বাইরের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর পেছনে খরচ না করে যেন দেশের জনগণের দিকেই বেশি নজর দেয়। তবে, এখনো পর্যন্ত সেরকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না যে, ইরান তাদের এই মিত্রদের থেকে সরে আসবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার : ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। যখনই কোনো আলোচনায় শর্তের বিষয়টি সামনে আসে তখন তারা আন্তর্জাতিক এই নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। শুক্রবার পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের কালিবাফ বলেছেন, আলোচনার আগে ইরানের প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার বা ৮৯ বিলিয়ন পাউন্ড জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করতে হবে। আলোচনা সফল হতে জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্তের বাইরে আরেকটি হলো লেবাননের যুদ্ধবিরতি।
তবে গত সাতই এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে জব্দকৃত সম্পদ মুক্তের বিষয়টি ছিল না। ফলে কালিবাফ ঠিক কোন চুক্তির কথা বলছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটা খুব বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না যে, শুধু আলোচনা শুরু করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন এতবড় ছাড় দিতে রাজি হবে।












