মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে ঘিরে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় তেল বিক্রিতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। ফিলিং স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় ও তেল সংগ্রহের প্রবণতা বাড়ায় যানবাহনভেদে তেল বিক্রির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে তেল কিনতে প্রচুর ভিড় দেখা গেছে। কোনো কোনো পাম্প ঘিরে আধা কিলোমিটার লম্বা লাইনের সৃষ্টিও হয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে–এমন আশঙ্কায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার হিড়িক পড়েছে। অনেক চালক তাদের গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে তেল সংগ্রহ করছেন। এতে নগরের বেশ কিছু পেট্রোলপাম্পে আধা কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে কিছু ফিলিং স্টেশনে মজুত তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
গতকাল বিকেলে কয়েকটি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, প্রচুর ভিড়। শত শত মোটর সাইকেল ও গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনছে। ক্রেতার চাপ সামলাতে হিমশিম খেয়ে কোনো কোনো পাম্প তেল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
একটি পাম্পের এক শ্রমিক জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই তেল নিতে গাড়ির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে দ্রুত মজুত শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে তেলের অর্ডার দেওয়া হয়েছে, সরবরাহ এলে আবার বিক্রি শুরু করা হবে। নগরীর গণি বেকারি মোড়ে অবস্থিত কিউ সি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের অন্তত আধা কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দাঁড়িয়ে আছে।
পাম্পটির কর্মকর্তা মনির বলেন, ‘আমাদের কাছে তেলের কোনো সংকট নেই এবং দামও বাড়েনি। তেল সংকট হবে–এমন কোনো তথ্যও আমাদের কাছে নেই। তারপরও মানুষ কেন এত ভিড় করছে বুঝতে পারছি না।’
লাইনে দাঁড়ানো এক মোটরসাইকেল চালক জানান, গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও তেল সরবরাহ সংকটের খবর দেখে তিনি কয়েকদিনের জন্য অতিরিক্ত তেল নিতে এসেছেন।
চালক কামরুল ইসলাম বলেন, তিনি মুরাদপুর থেকে নিউমার্কেট রুটে যাত্রী পরিবহন করেন। নগরের বেশিরভাগ পাম্পেই এখন তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন রয়েছে। কিছু পাম্প আবার নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দিচ্ছে না বলেও জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার বিপিসি জানায়, জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে এখন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তেল বিক্রির সময় গ্রাহককে রসিদ দিতে হবে এবং পরবর্তীবার তেল কিনতে হলে আগের রসিদ দেখাতে হবে।
বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফিলিং স্টেশনগুলোকে তেলের ধরণ, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ভোক্তাকে রসিদ দিতে হবে। প্রতিবার তেল নেওয়ার সময় আগের ক্রয়ের রসিদ প্রদর্শন করতে হবে। ডিলাররা বরাদ্দ ও গ্রাহকের ক্রয় রসিদ যাচাই করে তেল সরবরাহ করবেন। পাশাপাশি প্রতিটি ফিলিং স্টেশনকে তাদের মজুত ও বিক্রির তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপোতে জানিয়ে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে এবং কোনো অবস্থাতেই বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করা যাবে না।
যানবাহনভেদে তেল বিক্রির নতুন সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন, ব্যক্তিগত গাড়ি (কার) সর্বোচ্চ ১০ লিটার, এসইউভি (জিপ) ও মাইক্রোবাস : ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ বা লোকাল বাস : ৭০ থেকে ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনার মুভার ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
বিপিসি জানিয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে কখনও কখনও আমদানি কার্যক্রমে বিলম্ব বা সাময়িক বাধা তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচারের ফলে অনেক ভোক্তার মধ্যে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অনেক ডিলার আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ তেল ডিপো থেকে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা ও ডিলার প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন–এমন তথ্যও সরকারের নজরে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী বিদেশ থেকে জ্বালানি তেলের চালান দেশে আসছে এবং প্রধান স্থাপনা থেকে সারাদেশের বিভিন্ন ডিপোতে রেলওয়ে ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। বিপিসি আশা করছে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত বাফার স্টক গড়ে উঠবে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।












